সৌভিক ঘোষাল

সাহিত্যের ছাত্র। মার্ক্সবাদী মতাদর্শে আস্থাশীল। মার্ক্সবাদকে সমকাল ও ভারতীয় প্রেক্ষিতে জানাবোঝা ও প্রয়োগের কাজে যুক্ত। 

[দেশ জুড়ে মাঝে মাঝেই ইউনিভার্সাল সিভিল কোড নিয়ে বিতর্ক ওঠে। বিজেপি যথেষ্ট গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর সেই নিয়ে বিতর্ক আবারো সামনে এসেছে। এই বিতর্কে গণতান্ত্রিক শক্তি বিশেষভাবে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে ‘মুসলিম পার্সোনাল ল’ বা পারিবারিক আইন ও তার সংস্কারকে কীভাবে দেখতে পারে, তা নিয়ে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে একটি মতামত গঠনের লক্ষ্যে এই লেখাটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত গড়িয়ে গেলো (আমাদের মতে) সংস্কারের প্রধান প্রতিবন্ধক ভোটব্যাঙ্ক পলিটিকস ও অতঃপর তা থেকে একটি র‍্যাডিকাল ডিপারচার এর সম্ভাবনা বিন্দুর দিকে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে লেখাটি অনেকটাই ছড়ানো ছেটানো একটা চেহারা নিল, প্রবন্ধের প্রকৃষ্ট বন্ধন হয়ত তাতে আর তেমন রইলো না। আর একটা কথা। মূল লেখাটির আগে একটু বিধি সম্মত সতর্কীকরণ এর মতোই যেন মনে রাখা দরকার নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে আইন বদলের প্রশ্নটি শুধু মুসলিম পারিবারিক আইন বদলের প্রশ্নের মধ্যেই সীমায়িত নয়। বদল দরকার চরম পুরুষতান্ত্রিক অন্যান্য ধর্ম ভিত্তিক আইনগুলিরও, যেমন হিন্দু পারিবারিক আইন, খ্রীষ্টান পারিবারিক আইন ইত্যাদির। বদলের দরকার ইন্ডিয়ান পিনাল কোডেরও, যেখানে লিঙ্গ সংবেদনশীলতার এখনো যথেষ্ট অভাব আছে। এখনো পর্যন্ত ‘ম্যারিটাল রেপ’ বা বৈবাহিক সম্পর্ক মধ্যবর্তী ধর্ষণ কে আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি, ব্যাভিচার (অ্যাডালটারি) বিষয়ক আইনটিও নারীর অবমাননা সূচক। এই সমস্ত আইনের সংস্কার বিষয়ে নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবিগুলিকে পূরণ করা জরুরী, আর এগুলি কোনওভাবেই বিজেপির অ্যাজেন্ডায় পড়ে না, বরং তারা এসব ক্ষেত্রে প্রচলিত স্থিতাবস্থার পক্ষে ও নারী স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। এখানে লিঙ্গ সংবেদনশীলতার দৃষ্টিকোণে সামগ্রিক আইন সংস্কার প্রক্রিয়ার দাবির অঙ্গ হিসেবেই মুসলিম পারিবারিক আইন এর সংস্কার এর বিষয়টিকে দেখতে হবে, তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়। আর এই সংস্কারে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনও সংস্কার এর পরিবর্তে মুসলিম সমাজ বিশেষত নারীদের মধ্য থেকে উঠে আসা দাবিগুলিকেই গুরূত্ব দিতে হবে। এবার শুরু করা যাক।]

আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ার চলে গেছেন এক বছর হল। সারা জীবন তিনি ইসলাম ও আধুনিকতার সম্পর্ক নিয়ে ভেবেছেন, মুসলিম নারীদের অধিকার আন্দোলন নিয়ে লড়াই করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক প্রতিনিধি স্থানীয় মানুষ, যিনি নিষ্ঠা দক্ষতা জ্ঞান ও আন্তরিকতার মিশেলে শেষপর্যন্ত এক শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন। রাজস্থানের সালুম্বারে এক দাউদি বোহ্‌রা আমিল (যাজক) পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল। বাল্যেই তাঁর পিতা শেখ কুরবান হুসেনের কাছ থেকে তিনি আরবি ভাষা শেখেন। প্রথম জীবনেই তাঁকে কোরানের তফসির (টীকা), তব্‌ইল (সুপ্ত অর্থ), ফিক্‌ (ব্যবহারশাস্ত্র) এবং হাদিস (পয়গম্বরের শিক্ষা ও বাণী)-এর শিক্ষা দেওয়া হয়। পরে অবশ্য তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বৃহৎ মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশনে কাজ করেছিলেন। ১৯৭০ সালের গোড়ায় তিনি তাঁর চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে নিজের দাউদ বোহ্‌রা সমাজের সংস্কারের কাজে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন। এই কর্মকাণ্ডের অঙ্গ হিসেবে ১৯৮০ সালে `ইন্সটিট্যুট অব ইসলামিক স্টাডিজ’ এবং ১৯৯৩ সালে `সেন্টার ফর স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেকুলারিজম্‌’ প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করতেন এবং সমান চোখে দেখতেন। তাঁর লেখা প্রায় পঞ্চাশটি বইয়ে তাঁর এই চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁরই দাউদি বোহ্‌রা সমাজের কট্টরপন্থীদের হাতে তিনি একাধিকবার নিগৃহীত হয়েছেন। তবু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার গোঁড়া ধর্মান্ধদের কাছে কখনো মাথা নোয়াননি। ১৯৯০ সালে কলকাতায় ‘লোকবিদ্যা কেন্দ্র’র এক সভায় আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ার ইসলামের সেকুলার তাৎপর্য্য নিয়ে বলেছিলেন। তিনি সেকুলারিজমের ‘ধর্মহীনতা’র অর্থে বিশ্বাস করতেন না। ধর্মের আওতায় থেকেই মুসলিম পার্সোনাল ল কে যুগোপযোগী করার কথা তিনি ভেবেছেন আর তা মুসলিম ধর্মতত্ত্বর তাত্ত্বিক আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই করা সম্ভবপর বলে তাঁর মনে হয়েছে। ভেতর থেকে সংস্কার এর গ্রহণযোগ্য এই পদ্ধতিটি শুধু ইসলামিক সমাজের জন্য নয়, সারা ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কাছেই অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ। ২০১২ সালে মৃত্যুর এক বছর আগে তিনি ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ এর পক্ষ থেকে মুসলিম পার্সোনাল ল এর চেহারা কেমন হতে পারে তার একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া হাজির করেন সংশ্লিষ্ট বহুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে।

কেন এই আইন সংগ্রহ প্রয়োজন তার বিস্তারিত ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন। গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই বিভিন্ন সময়ে মুসলিম মহিলারা জানিয়েছেন তারা শরিয়তি আইনের ভুল প্রয়োগের মাধ্যমে পুরুষদের দ্বারা নানাভাবে শোষিত হয়েছেন। আসগর আলি মনে করেছেন এই ভুল প্রয়োগ সম্ভব হয়েছে শরিয়তি আইনের কোনও সর্বজনমান্য আইনি সার সংগ্রহ রূপে না থাকায়। বিচারে ব্যক্তির নিজস্ব বিচারধারাই সক্রিয় থেকেছে এবং সেখান থেকেই এই সমস্ত ভুলগুলি ব্যাপক আকারে ঘটেছে। ভুলগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আইন গুলির মৌলিক স্পিরিটটিই এই সমস্ত রায়ে লঙ্ঘিত হয়েছে। সমস্ত মুসলিম প্রধান দেশে তো বটেই, ভালোসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী বাস করেন এমন সমস্ত অ-মুসলিম দেশেও মুসলিম পারিবারিক আইন সুসংবদ্ধ সার সংগ্রহ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। পরমাশ্চর্য হলো ভারতে তা নেই এবং এই ব্যতিক্রম এর নিরিখে বিশ্বে ভারতই একম অদ্বিতীয়তম। মনে রাখতে হবে ইন্দোনেশিয়ার পরে ভারতেই সর্বাধিক মুসলিম জনগণের বাস। মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড এর বিরোধিতাতেই ভারতে এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার চলছে এবং মুসলিম মহিলারা নানারকম বিড়ম্বনার স্বীকার হচ্ছেন।

এই আইনি সার সংগ্রহ তৈরির চেষ্টার সঙ্গে যে শরিয়তি আইনকে বদলে ফেলার কোনও সম্পর্ক নেই, সেটাও আসগর আলি স্পষ্ট করেছেন। মুসলিম পারিবারিক আইনের পূর্ণাঙ্গ খসড়াটি হাজির করার আগে তিনি মুসলিম আইনের বিভিন্ন ধারার কথাও তুলেছেন। ইসলামিক আইন যে দেশকাল নিরপেক্ষ হতে পারে না সে বিষয়ে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি এনেছেন ইমাম শাফির ধ্রুপদী দৃষ্টান্ত। শ্রদ্ধেয় এই আইনবেত্তা সেকালে মদিনা থেকে মিশরে গিয়ে তাঁর আইনগত ধারণাবিধিকে অনেকখানি বদলে ভিন্ন দেশের নিজস্ব প্রেক্ষিতের কথা মাথায় রেখে। প্রথম দিকে ইসলামিক আইন বিষয়ে প্রায় শতাধিক ধারা (ইসলামিক স্কুলস অব ল) ছিল, এখনো তার মধ্যে বেশ কয়েকটি ধারাই সক্রিয় ও অনুসৃত হয়, যেমন হানাফি, শাফী, মালিকি, হাম্বলী। ভারতে বেশিরভাগ মুসলিম হানাফি ধারাই অনুসরণ করেন, যদিও কোঙ্কন উপকূল, কেরালা আর তামিলনাড়ুর অনেক মুসলিম অনুররণ করেন শাফি ধারা। এই ভিন্নতার নির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। কোঙ্কন, তামিলনাড়ু ও কেরালার মুসলিম সংযোগে রয়েছে সমুদ্রপথ, অন্যদিকে উত্তর ভারতের মুসলিমরা মূলত ইরাক, আফগানিস্থান ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থলপথে সংযুক্ত থেকেছেন।

এদেশে মুসলিম পারিবারিক আইনের একটি সারসংগ্রহ তৈরির জরুরী কাজটি করতে গিয়ে আসগর আলি ইসলামের দুটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সে দুটি হল সাম্য ও ন্যায়। এই দুটি আদর্শকে মান্য করতে না পারলে শরিয়তি আইন ইসলামের মূল আদর্শকে রক্ষা করতে পারবে না। নারীর সমানাধিকারের প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আসগর আলি কয়েকটি দৃষ্টান্ত এনেছেন প্রফেট মহম্মদ এর নির্দেশিকা থেকে। ভারতের অনেক ইসলামিক আইন বিশেষজ্ঞই পুরুষের দ্বারা নারীর শোষণের প্রশ্নটি তুলেছেন এবং তাকে ইসলামের মৌলিক সাম্য নীতির বিরোধী বলে গণ্য করেছেন। মৌলবী মুমতাজ আলি খান ও মৌলবী চিরাগ আলি এ বিষয়ে দুটি উল্লেখযোগ্য নাম। মৌলবি মুমতাজ আলি খান ‘নারীর অধিকার’ (হুকুক উল নিশা) নামে একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি কোরান এবং সুন্নার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন কোরান অনুযায়ী নারী অবশ্যই পুরুষের সমানাধিকারের দাবিদার এবং সে কোনবিচারেই পুরুষের থেকে কম কিছু নয়। এই বইটিকে সুকৌশলে চেপে দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামের মৌলিক আদর্শ বিরোধী পুরুষ আধিপত্যবাদী আইনী ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। অথচ কোরানের ২.২২৮ সংখ্যক সূক্তটি অনুসরণ করলে নারীর সমানাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। প্রফেট মহম্মদের জীবনের কিছুটা সময় বাদ দিলে ইসলামিক সমাজে প্রায়শই চতুর্থ শতাব্দীর প্রাক ইসলামী ইরান ও মধ্য এশিয়ার সামন্তী সমাজের পুরুষতান্ত্রিক রূপগুলি আধিপত্য করেছে। ভারতেও তারই প্রকোপ দেখা যায়। বিপ্রতীপে কোরানের ব্যাখ্যা করে আসগর আলি দেখিয়েছেন যে কোরানে পুরুষের আধিপত্যসূচক স্বামী স্ত্রী (বাওল) মাত্র দুবার ব্যবহৃত হয়েছে, পরিবর্তে প্রায় সর্বত্র দম্পতি (জাওজ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যেটি সমানাধিকারের অর্থ বহন করে। কোরানের মনোযোগী পাঠ থেকে দেখা যায় স্ত্রী, মা, কন্যা বা বোনের অধিকার রক্ষা বিষয়ে পুরুষকে বারবার সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, প্রায় কোথাওই কিন্তু স্ত্রীকে স্বামীর প্রতি কর্তব্য পালনের নির্দেশ দেওয়া নেই।

খসড়া আইনি সার সংগ্রহ তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রচলিত ধারণাগুলিকে আসগর আলি অনেক সময়েই নস্যাৎ করেছেন। যেমন বহুবিবাহ। বর্তমান ভারতে মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটি নিবারণের কোনও বিধি সেভাবে নেই। কিন্তু খুশিমত চারটি পর্যন্ত বিবাহ করা কোরানের স্পিরিট এর প্রতি অবমাননা। কোরান মোটেই বহুবিবাহকে উৎসাহ দেয় না বরং নারীর প্রতি ন্যায়ধর্ম পালনকেই সর্বাগ্রে গুরূত্ব দেয়। এটা বিশেষভাবে মনে রাখার একাধিক বিবাহের প্রসঙ্গটি কোরানে এসেছে (৪.৩ নং সূক্ত) উহুধ যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিধবা ও শিশুদের অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গে, কেননা সেই যুদ্ধে প্রায় দশ শতাংশ মুসলিম পুরুষ মারা গিয়েছিলেন এবং বহু নারী বিধবা হন, বহু শিশু অনাথ হয়ে যায়। আজকের দিনে অনেক উলেমারাই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণে রক্ষা বহুবিবাহকে সমর্থন করে বসেন এবং যুক্তি দেন এটা বন্ধ করলে সমাজে বেশ্যাবৃত্তি উৎসাহ পাবে। তারা কোরানকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং ভুলে যান কোরান বলেছে একাধিক স্ত্রীকে সমমর্যাদা দিতে না পারলে একটি বিবাহই বাঞ্ছনীয়। পৃথিবীর নানা দেশেই মুসলিম পার্সোনাল ল কে আইনি সার সংগ্রহর আকার দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে বহুবিধ রক্ষাকবচ রাখা হয়েছে। প্রায় কোনও দেশেই আইনি নিরীক্ষার বাইরে গিয়ে দ্বিতীয় বিবাহ করা মুসলিমদের পক্ষে সম্ভবপর নয় এবং ভারতই এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। একই কথা প্রযোজ্য তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের প্রসঙ্গেও। সেখানে তিন তালাক ব্যবস্থার পরিবর্তে কোরান সম্মত তালাক আল সুন্নাহ কে তাঁরা গ্রহণ করার কথা বলেছেন। বিবাহ ও বিচ্ছেদের সম্পর্কে কোরানের ২.২২৯ সংখ্যক সূক্ত বলছে নারীকে সদাশয়তার সঙ্গেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে হবে অথবা বিনম্রতার সঙ্গেই পরিত্যাগ করতে হবে। খুশিমতো তাকে পরিত্যাগ এর বিধান কোরান দেয় নি। অন্যান্য দেশে এ বিষয়ে নারী অধিকার সম্বলিত যে রক্ষাকবচগুলি রাখা হয়েছে, ভারতে তা নেই। স্বাভাবিকভাবেই আসগর আলি ও তাঁর সহকর্মীরা খসড়া আইনি সার সংগ্রহ তৈরির সময়ে এ বিষয়গুলির প্রতি যত্নবান হয়েছেন।

বিজেপির মত সংগঠন অনেকদিন ধরেই ইউনিভার্সাল সিভিল কোডের প্রচলনের মধ্য দিয়ে সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত নির্দিষ্ট কিছু অধিকার, যেমন মুসলিম পারিবারিক আইনকে তুলে দিতে চাইছে। তাদের অজুহাতের অন্যতম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে মুসলিম সমাজে নারী অধিকারের প্রশ্নটি, যদিও তারাই আবার সামন্তী মানসিকতার সবচেয়ে তীব্র প্রথাগুলির মদতদাতা, যার মধ্যে রয়েছে খাপ পঞ্চায়েত এর মাধ্যমে ভিন জাতের মধ্যে বিবাহকে রোখা, সমকামী অধিকারকে কোতল করা, নারীর অধিকারকে মনুস্মৃতির আদলে বোতলবন্দি করার মত অসংখ্য দিক। বিপরীতে আমাদের রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস এর মতো শাসক দলকে দেখছি মুসলিমদের কেবল ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করতেই তারা সচেষ্ট। মুসলিম সমাজ সংস্কারের প্রতি সদর্থক মানসিকতার পরিবর্তে ইমাম মোয়াজ্জেনদের তুষ্ট করার নানা পদ্ধতি গ্রহণ করে মুসলিম সমাজকে মৌলবীদের তাঁবে রেখে দিতে চায় তারা। এই দুই বিপরীত প্রক্রিয়াকে একই সঙ্গে বর্জন করা দরকার। ভারতের মত বহু সংস্কৃতির দেশে গণতান্ত্রিক শক্তি ও আন্দোলনকে অবশ্যই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কিছু বিশেষ অধিকার দিতে হবে এবং সেই সমাজের ভেতর থেকে উঠে আসা প্রগতিশীল সংস্কার আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে হবে। ইউনিভার্সাল সিভিল কোডের মাধ্যমে মুসলিম পারিবারিক আইন এর বিলোপ নয়, আসগর আলি ইঞ্জিনিয়রদের মতো তার জরুরী সংস্কারের দিকে এগোনোই এক্ষেত্রে যথার্থ রাস্তা হতে পারে।

এই সংস্কারের দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা কি? মুসলিমদের মধ্যে এই ধরণের আন্দোলনের অভাব ? তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় না। আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ারদের দীর্ঘ লড়াই বা ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলনের ধারাবাহিক নিরলস প্রভাব সঞ্চারী কার্যক্রমের কথা আমাদের গোচরে নেই তা নয়। কিন্তু তা কেন আরো বিশিষ্ট স্বর হয়ে উঠতে পারছে না? এর প্রধান কারণ নিশ্চিতভাবে ভোট ব্যাঙ্ক পলিটিকস। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হলে যে ধরণের আর্থিক নীতিমালা গ্রহণ করা দরকার, পুঁজিবাদ এর লুঠতরাজ এর রক্ষী সরকারগুলো তা করতে রাজী নয়, বরং পুঁজিপতি বাবুদের খুশি রাখতে গেলে তাদের বিপ্রতীপ মুজরোই নাচতে হবে। তাই সহজ উপায় ভোট ব্যাঙ্ক পলিটিকস। উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম এই রাজনীতি করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রাজনীতিতে সম্প্রতি হাত পাকিয়ে পরের পর নির্বাচনে ভালোই সাফল্য পেয়ে চলেছেন। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে বা পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের অবস্থার আদৌ কোনও উন্নতি হয় নি। এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গে সমাজ গণতন্ত্রী বামেদের দীর্ঘ শাসনের ছবিও মোটেই উজ্জ্বল নয়। সাচার কমিটির রিপোর্ট সমাজ গণতন্ত্রী বামেদের মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক পলিটিকস এ সামিল হয়ে গিয়ে উন্নয়নকে উপেক্ষা করার দিকটিকে একেবারে উলঙ্গ করে দিয়েছে। সাচার কমিটির রিপোর্ট বুহিয়ে দেয় যে মুসলিমদের মনে করা হত তারা পশ্চিমবঙ্গে বামেদের স্বাভাবিক মিত্র, তারা কেন ব্যাপকভাবে পাশার দান উলটে দিল।

অধিকাংশ দলের হিন্দুত্ববাদী (নরম বা গরম) অবস্থান এবং তথাকথিত `মিত্র’ বা সহানুভূতি সম্পন্নদেরও তাদের সার্বিক উন্নয়নের পরিবর্তে ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে নেবার প্রবণতা ক্রমশ চিন্তাশীল মুসলিমদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণেই মুসলিম জনসমাজকে পশ্চাদপদ মতাদর্শ ও ইমামকুলের কাছে বন্ধক রেখে চট জলদি ভোট বাগিয়ে নেওয়া মেইনস্ট্রিম দলগুলির বিপ্রতীপে নিজেদের দল গড়ে তোলার একটা কথা অনেকেই তুলছেন। মুসলিম ও দলিত সংখ্যাতত্ত্বকে সামনে রেখে তাদের ঐক্যর ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির কথা বলছেন অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী। তাদের সেই মতামতের সঙ্গে প্রগতিশীল অবস্থান থেকে আমাদের অবশ্যই দ্বান্দ্বিক সংলাপ চালাতে হবে।

আমরা লক্ষ্য করছি অনগ্রসর ও সংখ্যালঘুদের পিছিয়ে থাকা ও সেইসূত্রে এই অংশের মানুষের রাজনৈতিক তথা সার্বিক ক্ষমতায়ন এই সময়ের পত্রপত্রিকার দুনিয়ায় আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন থেকে ইতিহাসবিদ শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচিত বামপন্থী রাজনৈতিক মুখ ও দীর্ঘদিনের বিধায়ক রেজ্জাক মোল্লা থেকে বিভিন্ন পত্রিকার খ্যাত বা স্বল্প পরিচিত নানাজনের নানা লেখালেখিতে এই নিয়ে মতামত, আলোচনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ প্রাবল্য লাভ করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ফারুক আহমেদ সম্পাদিত ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার একটি সংখ্যা, যার বিষয় ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনগ্রসর ও সংখ্যালঘু’। সংখ্যাটি মুসলিম রাজনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন চিন্তাভাবনার আকর। আপাতত আমরা বিস্তারিত আলোচনার জন্য বেছে নিচ্ছি প্রতিনিধিস্থানীয় একটি লেখা। পত্রিকার প্রথম নিবন্ধ ড. মহ আফসার আলীর `সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক লেখাটি।

সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ড. মহ আফসার আলী এদেশের জনগণকে মূলনিবাসী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী – এই দুই গোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন। এই বিভাজন অনুযায়ী তপশীলী জাতি, তপশীলী উপজাতি ও সেখান থেকেই একসময়ে ধর্মান্তরিত মুসলিমদের একটি জোটের মধ্যে রেখেছেন তিনি, যারা দেশের ৮৫ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে উচ্চবর্গীয় হিন্দু ১৫ শতাংশ। তপশীলী জাতি, উপজাতিরা কোনদিনই হিন্দু ছিল না, তাদের হিন্দু বানানোর চেষ্টা চলছে বলে মনে করেছেন প্রাবন্ধিক। তিনি লিখেছেন, “১৯১১ সালের জনগণনা পর্যন্ত এই লোকগুলিকে অপ্রেসড ক্লাস বলা হত এবং জনগণনার ফর্ম এ ইহাদের জন্য আলাদা জায়গা ছিল। ১৯৪১ সাল থেকে তাদের আলাদা অস্তিত্বের পরিচায়ক সেই জায়গাটা তুলে দিয়ে হিন্দুত্বের মধ্যে লীন করার প্রচেষ্টা হয়েছে। … সুতরাং এস সি ও এস টি রা হিন্দু নয়, তবে তাদেরকে হিন্দু বানানোর চেষ্টা চলছে। আর ওবিসিদের একটা বড় অংশকে ‘রাজনৈতিক হিন্দু’ বানিয়েছে, ধর্মে ও ক্ষমতায় কোনও অধিকার দেয় নি”।

জনগণনার এই সমীকরণ স্বত্ত্বেও দীর্ঘলালিত এক বঞ্চনার প্রক্রিয়ায় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সমস্ত সুযোগ সুবিধা থেকে দেশের `মূলবাসীদের’ অনেকাংশে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। মণ্ডল কমিশন রিপোর্ট (১৯৯২) উদ্ধৃত করে প্রাবন্ধিক প্রদত্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিভিন্ন বর্গ ও রাজনীতি, পরিষেবা (চিকিৎসক/শিক্ষক/আইনজ্ঞ ইত্যাদি), ব্যবসা বাণিজ্য ও জমির ওপর দখলদারির ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের শতাংশমাত্রাটি নিম্নরূপ -

শ্রেণি        জনসংখ্যা  রাজনীতি  পরিষেবা   ব্যবসা  জমি
হিন্দু উচ্চবর্ণ   ১৫         ৬৬         ৮৭       ৯৪     ৯২
ওবিসি          ৫২            ৮            ৭ ২.     ৩      ৫
এসসি/এসটি   ২২.৫       ২০.৫          ৫         ০.২    ১
সংখ্যালঘু       ১৫           ৫.৫           ১         ৩.৫   ২

নিশ্চিতভাবেই মণ্ডল কমিশন বা পরবর্তীকালের সাচার কমিশন এর রিপোর্টগুলি উচ্চবর্গের তুলনায় দলিত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পিছিয়ে থাকার স্পষ্ট চিত্রকে তুলে ধরে। এই বাস্তবতার সমাধানসূত্র হিসেবে ড. আলীর মত চিন্তাবিদদের নিদান রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা। আলীর ভাষায় “রাজনীতির সঙ্গে ক্ষমতায়নের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক আছে। যে সম্প্রদায় এই সম্পর্কটা বুঝতে পারে না বা বুঝতে চায় না, তাদেরকে চরম মূল্য দিতে হয়”। আলী মনে করেছেন স্বাধীনতার পর দলিত ও সংখ্যালঘুরা নিজেদের রাজনৈতিক দল তৈরি না করে বিভিন্ন ব্রাক্ষণ্যবাদী দলের লেজুরবৃত্তি করেছে ও তাদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে। “উচ্চবর্ণীয়রা জাত সচেতন, তাই নিজেদের জাতের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে একাধিক রাজনৈতিক দল তৈরি করেছেন। এবং প্রতিটি দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছেন। তাই রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধাভোগের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু, দেশের ৮৫ শতাংশ মুসলমান ও দলিত জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের উপায় হল, উচ্চবর্ণীয়দের মডেল অনুসরণ করা, অর্থাৎ নিজেদের জাত সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং নিজেদের নেতৃত্ব, নিজেদের সমাজের জন্য রাজনৈতিক দল তৈরি করা”। এই প্রসঙ্গে দলিত ও মুসলিমদের নিজেদের রাজনৈতিক দল ও জোটের সাফল্যজনক উদাহরণ হিসেবে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী দশ বছরের সফল নেতৃত্বের ইতিহাসের কথা বলেছেন প্রাবন্ধিক, ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ও যোগেন মণ্ডল এর `স্বাধীন তফসিলি দল’ এর রাজনৈতিক আধিপত্যর কথা তুলেছেন।

সেই ইতিহাস ও তার বিশ্লেষণ এখানে আমরা করতে চাইছি না, পরবর্তীকালে কোনও পরিসরে এ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের ইচ্ছা রইলো। কিন্তু বর্তমান ভারতীয় বা বাংলার রাজনীতিতে এই ধরণের দলিত আইডেনটিটি ভিত্তিক দল বা সংখ্যালঘু আইডেনটিটি ভিত্তিক দল যে অনুপস্থিত তা নয়। এই ধরণের দলগুলি কেন দলিত বা সংখ্যালঘুদের একজোট করতে বা তাদের নিয়ে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে না বা পারছে না তার কোনও উল্লেখ বা বিশ্লেষণ প্রাবন্ধিক এখানে করেন নি। নতুনভাবে গড়ে ওঠা কোনও একটি রাজনৈতিক দল বা জোট গড়ে উঠলে কীভাবে সে সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠবে, তা বোঝার জন্যও বিদ্যমান সংগঠনগুলির সমস্যার বিশ্লেষণটা জরুরী ছিল। সেই বিশ্লেষণ বা প্রসঙ্গ এড়িয়ে প্রাবন্ধিক সোচ্চারে কমিউনিস্ট পার্টিগুলিকে তিরবিদ্ধ করতে চেয়েছেন।

প্রাবন্ধিক ড আলী তাঁর লেখায় মাঝে মাঝেই মার্কস থেকে কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু মার্কসবাদী বিশ্লেষণের কোনও চেষ্টাই তাঁর লেখায় করেন নি। বরং মার্কসবাদী পথের উলটোমুখে হেঁটে অর্থনীতির চেয়ে সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক বিষয়গুলিকে সামনে এনেছেন। সবচেয়ে বড় কথা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে, দলিত ও সংখ্যালঘু প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর গৌরবোজ্জ্বল লড়াই সম্পর্কে তার কোনও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ দূরে থাক, বালখিল্য ও অসত্য তথ্যভিত্তিক অসার বিশ্লেষণই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন “উন্নত এগিয়ে থাকা শাসক ও শোষক সম্প্রদায়রা এই সাম্যবাদের স্লোগানকে লুফে নিল, সর্বহারাদের ক্ষমতায়নের ঝাণ্ডা নিয়ে এগিয়ে চলল। হাজার বছর ধরে পড়ে থাকা মূলনিবাসী মুসলমান ও দলিত সমাজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাম্যবাদের ঝাণ্ডা সমাজবাদ উচ্চবর্ণীয়দের দ্বারা হাইজ্যাক হয়ে গেল। শোষকরাই প্রলেতারিয়েতদের (শোষিতদের) ত্রাণকর্তা হিসেবে জামা বদল করে মসনদ আবার দখল করল, তারা `মার্কসবাদী’ হলেন, নেতা মন্ত্রী হলেন। মুসলমান ও দলিত প্রলেতারিয়েতরা যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই থেকে গেলেন; তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হল না”। “আমাদের দেশের নির্যাতিত শ্রেণিদেরকে মার্কসবাদের আলোয় আসতে দেওয়া হয়নি, তাদেরকে নেতৃত্বে আসতে দেওয়া হয়নি; তাই তাদের মুক্তিও হয়নি। মার্কসবাদের নামে উচ্চবর্ণীয় আধিপত্যই এদেশে কায়েম হয়েছে। তাই মার্কসবাদ ইন্ডিয়াতে ব্যর্থ হল। অধরা থেকে গেল সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন”।

ড. আলী একটি নির্দিষ্ট (মনোগত) নিরিখ থেকে অক্লেশে `ডান বাম রাম’ দলগুলিকে এক করে লিখতে পারেন, “ইন্ডিয়াতে বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর; ডান – বাম – রাম সর্বত্রই, কর্তৃত্ব কায়েমকারী সকল পদে একচেটিয়া উচ্চবর্ণীয়দের আধিপত্য। দলিত ও মুসলমানরা শুধুমাত্র ক্যাডার বাহিনী, ভোট শিকারী, লেঠেল বাহিনী, দাঙ্গা বাহিনী ইত্যাদি কাজগুলো করে দলের হাইকমাণ্ড এবং অন্যান্য উচ্চবর্ণীয় প্রভুদের স্বার্থসিদ্ধিতে সাহায্য করে”।

ভারতীয় কমিউনিস্ট/বাম রাজনীতির সীমাবদ্ধতা বা দুর্বলতাগুলিকে বোঝা বা আলোচনার চেষ্টা এক ব্যাপার ও তার গৌরবজনক লড়াইয়ের যাবতীয় ইতিহাসকে ভুলে থেকে, তাকে নস্যাৎ করা ও কালিমালিপ্ত করা সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যাপার। ড. আলী হয়ত ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুলে যেতে চান ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্বেই তার অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে উঠে আসেন মুজফফর আহমেদ। কেরালায় অসংখ্য কমিউনিস্ট নেতা কর্মীর দলিত মর্যাদা ও অধিকারের দাবিতে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী তীব্র ও অনেকাংশে নির্ণায়ক লড়াই আন্দোলন এর মধ্য দিয়েই সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি ব্যাপক জনভিত্তি অর্জন করে ও প্রথম কোনও অকংগ্রেসী সরকার হিসেবে রাজ্যের ক্ষমতায় আসে। বিহারে সি পি আই (এম এল) এর নেতৃত্বেই জরুরী অবস্থা ও তৎপরবর্তী সময়ে আরা ভোজপুর সহ মধ্য বিহার জুড়ে সামন্তবাদ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ও উচ্চবর্ণের সংগঠিত সেনাবাহিনী `রণবীর সেণা’র বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ দলিত ও সংখ্যালঘুর জমি জীবন জীবিকার অধিকার সুরক্ষিত হয়। অন্ধ্রে কমিউনিস্ট আন্দোলনই কয়েক দশক জুড়ে দলিত সংগ্রামের অন্যতম বীরত্বপূর্ণ আখ্যান তৈরি করেছে। ভারতের আদিবাসী জনগণ জল জমি জঙ্গলের অধিকার বজায় রাখার জন্য লড়ছেন লাল পতাকার সঙ্গে সমন্বিত হয়েই। বিপরীতে যে `মাননীয় কাঁশিরাম’ এর প্রশস্তিবাক্য ও উদ্ধৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে ড আলী দলিত ও সংখ্যালঘুদের মুক্তির পথরেখা সন্ধান করেছেন, সেই ধারার রাজনীতিই ক্রমশ দলিতবাদ থেকে ক্রমশ সুবিধাবাদের কোটরে নিজেকে নিয়ে গেছে, আর তার নেত্রীকে দলিত কা বেটী থেকে দলিত কা রাণী হয়ে উঠতে দেখেছে।

অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে বাদ দিয়ে শুধু আইডেনটিটি ভিত্তিক রাজনীতি যে দলিত বা সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন ঘটাবে না, সেটা এই ধরণের আইডেনটিটি সর্বস্ব রাজনীতির ব্যর্থতা থেকেই স্পষ্ট। দলিত হাইকমাণ্ড এর অবিসংবাদিতা স্বত্ত্বেও ভারতের এক নম্বর ব্রাক্ষণ্যবাদী ও চরম সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে দলিত-কা-রাণীর কোনও সমস্যা হয় নি, মুসলিম হাইকমাণ্ড পরিচালিত দলগুলিও অক্লেশে কংগ্রেসের মন্ত্রীসভায় নিজ নিজ আসন নিয়ে খুশি থেকেছেন। শাসক শ্রেণির রাজনীতিকে কোনও মৌলিক চ্যালেঞ্জ তারা জানাতে চান নি, সেটা স্বাধীনতার সময় থেকে কমিউনিস্ট রাজনীতির গৌরবজ্জ্বল অধ্যায়ের মধ্যেই সবচেয়ে ভালোভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে।

দলিত পরিচয় বা সংখ্যালঘু পরিচয় নিয়ে রাজনীতির অঙ্গনে সামনে আসার গুরূত্বের বিষয়টিকে কোনওভাবে লঘু না করেও কমিউনিস্টরা দলিত বা সংখ্যালঘুর ক্ষমতায়নের ভিত্তি হিসেবে তাদের অর্থনৈতিক উত্থান, তার সঙ্গে সম্পর্কিত জমির অধিকার বা শিক্ষার অধিকার, জীবিকার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছে। পাশাপাশি গুরূত্ব পেয়েছে অস্পৃশ্যতা বিরোধী, বর্ণবাদ বিরোধী, জাতি ও সংখ্যালঘু বিদ্বেষ বিরোধী রাজনীতি। সন্ত্রাসবাদের নামে সংখ্যালঘু যুবকদের নিশানা করাই হোক বা দলিত ও মুসলিমদের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বা দাঙ্গা নামিয়ে তাদের সন্ত্রস্ত করার চেষ্টাই হোক, কমিউনিস্টরা একে তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রুখতে চেয়েছে। দলিত ও সংখ্যালঘুর ক্ষমতায়নকে দেখার দৃষ্টিকোণে কমিউনিস্টদের সঙ্গে কাঁসিরামধর্মী রাজনীতির সুস্পষ্ট ফারাক আছে। কমিউনিস্টরা দলিতদের বা সংখ্যালঘুদের ব্রাহ্মণ্যবাদী ক্ষমতার উলটোপিঠ হয়ে ওঠার কথা বলে না বা তাদের বুর্জোয়া রাজনীতির অঙ্গীভূত হয়ে শাসক হয়ে ওঠার কথাও বলে না। কমিউনিস্টরা বিদ্যমান সমাজ অর্থনীতি কাঠামোর আমূল রূপান্তরের পদ্ধতির আধারেই দলিত ও সংখ্যালঘুর ক্ষমতায়নকে দেখে, তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বা তার বাইরে এনে নয়।

ভারতবর্ষের বুকে যে নতুন গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য কমিউনিস্টরা লড়াই চালাচ্ছে দলিত ও সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায়ন তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভিন্নমত স্বত্ত্বেও আলাপচারিতার ভিত্তিতে বিভিন্ন মত ও পথের সাথীরা বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে সেই গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গী হবেন, কমিউনিস্টরা এই আশা অবশ্যই করে। কিছু বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু দলিত ও মুসলিম ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যে সমস্ত আলোচনা চলছে তার সদর্থক প্রয়াসের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হতে কমিউনিস্টরা সর্বদাই আগ্রহী ও দায়বদ্ধ। সমাজ গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে অনেকটাই বিকৃত কমিউনিজমের যে প্রয়োগ এ রাজ্যে হয়েছে, তাকেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের একমাত্র বা প্রতিনিধিস্থানীয় অবস্থান ভেবে না নিলে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের দিনে এগোতেই পারে।