Tags » এপাশে ওপাশে

আতঙ্ক

আমাদের পাড়ায় একজন আছে যে বহু বছর আগে ইডেন গার্ডেন্সে একটা মোহনবাগান – ইস্টবেঙ্গল খেলা দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়েছিল। সেদিন ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আমার এই পাড়াতুতো কাকু জোর বেঁচে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন সোজা হয়ে হাঁটতে পারেনি। শুধু তাই নয়, এই সেদিনও বসে থাকতে থাকতে অকারণেই হঠাৎ চমকে উঠত — ট্রমা এমনই প্রবল। এত দীর্ঘ না হলেও, একটা স্বল্পমেয়াদী ট্রমা আমারও হয়ে যাচ্ছে বোধহয় — কিছু ছবি, কিছু শব্দ এমনভাবে গেঁথে যাচ্ছে মনে।
সর্বশেষ যে ছবিটা ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল সেটা হচ্ছে আজ সকালের কাগজে দেখা শ্রীরামপুর কলেজের এক অধ্যাপিকার ছবি। আতঙ্কে এভাবে কাঁদতে কোন দিদিমণিকে কখনো দেখিনি। মুহূর্তে প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়কার দিদিমণিদের মুখগুলো ভিড় করতে শুরু করল। খবরে প্রকাশ “আন্দোলনকারী” ছাত্ররা দিদিমণিদের বাথরুমের দরজাও ভেঙে দিয়েছে। প্রাক্তন নয়, বর্তমানদের কীর্তি এটা। এর আগে অন্যত্র এক দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারার ঘটনাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেখানে সান্ত্বনা ছিল এটুকু যে কান্ডটা ঘটিয়েছে এক নেতা, দিদিমণির কোন ছাত্র বা ছাত্রী নয়। এবারে আর সেকথা ভেবে নিজেকে শান্ত করা যাচ্ছে না। নির্ভয়াকান্ডের পর যখন সেই ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ আমাদের সামনে আসছিল, তখন যেমন মধ্যে মধ্যে নিজেকেই ধর্ষক মনে হত, তেমনি আজ কেন যেন মনে হল আমিই আমার ছোটবেলার স্নেহময়ী দিদিমণিদের বাথরুমের দরজা ভেঙে দিয়েছি। শিউরে উঠলাম। কি ভয়ঙ্কর ছাত্রকুল তৈরি করেছি আমরা! অন্যায় দাবী আদায়ের জন্যে মাতৃসমা দিদিমণিদেরও চূড়ান্ত লাঞ্ছনা করতে বুক কাঁপে না এদের। শুনছি আজকাল নাকি মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের ভাগে খুন, ধর্ষণের হুমকিও বাদ যায় না।
পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র আন্দোলন, এমনকি উগ্র, হিংসাশ্রয়ী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। নকশাল আন্দোলনের সময়ে (যা ছাত্রদের নেতৃত্ব সত্ত্বেও ছাত্র আন্দোলনের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না) হিট লিস্টে মাস্টারমশাইদের নাম উঠে যাওয়া, হত্যা — এসবের কথা শুনেছি। কিন্তু তখনো দিদিমণিদের উপর এ হেন আক্রমণ হয়েছে বলে জানি না। তাছাড়া অধ্যাপকদের কারো কারো বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা সত্ত্বেও সেইসব ছাত্ররা যখন পুলিশ বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছে বা পঙ্গু হয়ে গেছে — মাস্টারমশাইদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। যার সবচেয়ে জ্বলজ্বলে প্রমাণ সম্ভবত খুন হওয়া ছাত্রের স্মৃতিতে অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের সেই বিখ্যাত কবিতা

ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।

কয়েকবছর আগে যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হল হোক কলরব আন্দোলনে তখন আলোচিত হয়েছিল একদা উপাচার্য ত্রিগুণা সেনের কথা, যিনি নিজে কংগ্রেসি ছিলেন। কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় একবার তাঁকে ফোন করে বলেন “তোমার ক্যাম্পাসে দুটো কমিউনিস্ট লুকিয়ে আছে। পুলিশ যাচ্ছে, ওদের তুমি বের করে দাও।” উত্তরে উপাচার্য বলেন “আমি বেঁচে থাকতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশ আমার ছেলেদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।” হোক কলরব আন্দোলনেও তো যাদবপুরের মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা ছাত্রছাত্রীদের সাথেই ছিলেন। ফলে বোঝা যায় যে যা ছাত্র আন্দোলন তা শিক্ষকবিরোধী হয় না। শিক্ষকবিরোধী হয় গুন্ডামি, যা কোন ইতিহাসের তোয়াক্কা করে না।
এ রাজ্যে এখন স্কুল কলেজের শিক্ষক, অধ্যাপকরা ভীষণ বিপজ্জনক। তাঁরা উন্নয়নবিরোধী, তাঁরা রাজনীতি করেন, তাঁরা প্রচুর ছুটি পান (ঠিক সময়ে ইনক্রিমেন্ট, ডি এ ইত্যাদি যে পান না সেটা বলাও উন্নয়নবিরোধী), সবচেয়ে বড় কথা তাঁরা প্রতিবাদ করেন। অতএব এই বিপজ্জনক মানুষগুলোর হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে গেলে যা যা করার সে তো করতেই হবে। খুন, জখম, মারধোর, শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা যতটা সম্ভব। অতএব একদিকে তাঁরা খুন হচ্ছেন, খুনের সঠিক তদন্ত দাবী করে হাজতবাস করছেন। অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের হাতে মার খাচ্ছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন।
এই যে অবস্থার অবনতি এর জন্যে অনেকেই আবার শিক্ষককুলকেই দাবী করে থাকেন। শিক্ষকদের রাজনীতিই পশ্চিমবঙ্গের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছে এই কথাটা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। সেই কারণে কিছু অভিজ্ঞতার কথা এই বেলা বলে ফেলি। আর কিছুদিন পরে এসব বললে হয় লোকে বলবে বানিয়ে বলছি, নয় মারতে আসবে।
আমি যে স্কুলে পড়েছি ক্লাস ফাইভ থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত, সেই স্কুল সেইসময় হুগলী জেলার অন্যতম সেরা স্কুল থেকে রাজ্যের অন্যতম সেরা হয়ে উঠছে। আগ্রহী যে কেউ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের থেকে মাহেশ শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ফলাফল যাচাই করে নিতে পারেন। শুধু পরীক্ষার রেজাল্টের দিক থেকেই নয়, আরো নানা দিক থেকেই আমাদের স্কুল ছিল ব্যতিক্রমী। সে নাহয় কোন সুসময়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে লেখা যাবে। এখন এর কৃতিত্ব কার? অবশ্যই একজনের নয়। কিন্তু আমাদের মাস্টারমশাইরা বলতেন “সুধীরবাবু না থাকলে স্কুল এই জায়গায় আসত না।”
সুধীরবাবু অর্থাৎ আমাদের হেডস্যার সুধীরকুমার মুখোপাধ্যায়। ভদ্রলোক ঘোর সিপিএম। আমি যখন ঐ স্কুলের ছাত্র তখন উনি নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA) র জেলা সম্পাদক। সুধীরবাবুর সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছি আমার প্রিয় ইংরিজির মাস্টারমশাই সোমনাথবাবুর মুখে। স্যার একদিন বলেছিলেন “সুধীরবাবুর আগে কমিটি মেম্বাররা মিটিঙে চলে আসত লুঙ্গি পরে। উনি জলদগম্ভীর স্বরে বলেন ‘বাড়ি থেকে প্যান্ট পরে আসুন। সুধীরবাবুকে ছাড়া এমন হতেই পারত না।’” সোমনাথবাবু কোন শিক্ষক সংগঠনের সদস্য ছিলেন জানি না কিন্তু ঘোর গান্ধীবাদী লোক। বারবার বলেছেন “ঘরে দুটো লোকের ছবি রাখবি, আর কাউকে লাগবে না জীবনে — মহাত্মা গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ।”
আমাদের স্কুলের এসিস্ট্যান্ট হেডস্যার তখন পূর্ণবাবু। তিনি ইতিহাসের শিক্ষক, মার্কসবাদীদের ঘোর অপছন্দ করেন। একবার আমায় বলেছিলেন “সুধীরবাবুর সাথে আমার খুব তর্ক হয়। আমি বলেছি, আপনারা তো মুড়ি মিছরি এক দর করে দিতে চান।”
মার্কসবাদী সুধীরবাবু, গান্ধীবাদী সোমনাথবাবু আর দক্ষিণপন্থী পূর্ণবাবুর কখনো মতপার্থক্য হয়নি এমনটা নিশ্চয়ই নয়, কারণ সেটা অসম্ভব। কিন্তু তা বলে আমাদের স্কুলের উন্নতি থেমে থাকেনি, তরতরিয়ে এগিয়েছে। কেউ উলটো উদাহরণ দিতেই পারেন কিন্তু দুরকম উদাহরণেরই উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে সমস্যাটা শিক্ষকদের রাজনীতি করা নয়, খারাপ রাজনীতি করা। অবশ্য যারা অত্যাচারিত হচ্ছে তাদের রাজনীতিকেই দায়ী করা নেহাত গা জোয়ারি। সেখানে এতসব যুক্তি দিয়ে লাভই বা কী?
তপন সিংহের ছবিতে এক নিরীহ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রশ্রয়প্রাপ্ত, সমাজবিরোধী হয়ে যাওয়া প্রাক্তন ছাত্রকে খুন করতে দেখে ফেলেন। ছাপোষা, যুবতী মেয়ের বাবা মাস্টারমশাইকে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে মেনে নিতে হয় “আপনি কিন্তু কিছুই দ্যাখেননি, মাস্টারমশাই।” আমাদের মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের এবং আমাদেরও — এখন সেই অবস্থা। মানে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে বেঁচে আছি। ছবিতে শিক্ষকের কন্যার মত আমাদের কতজনের যে মুখ পুড়বে আগামীদিনে কে জানে! তবে সেই মাস্টারমশাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বার্ধক্যের লাঠিটাকে স্কুলজীবনের মত আবার শাস্তি দেওয়ার লাঠি করে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন ভয় দেখাতে আসা মস্তানকে।
মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের হাতে মার যারা খেয়েছে তারাই জানে সে মারের জোর কত। হয়ত এখনো পিঠ পাতার সময় হয়নি।

এপাশে ওপাশে

ভো ভো ভদ্রসন্তান

শেষপর্যন্ত এক মাস্টারমশাইকে মরতে হল ভদ্রসন্তানদের “এসব আগেও হয়েছে” র এলায়িত ঔদাসীন্য থেকে জাগানোর জন্যে। হতভাগ্য প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায় মরিয়া প্রমাণ করিলেন ভদ্রসন্তানগণের চেতনা মরে নাই। তাঁহারা আজিও নির্বাচনী হিংসার জন্যে সরকারকে দায়ী করিয়া গালাগাল করিতে সক্ষম।
মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়কার হিংসাটা নেহাত বিসদৃশ লাগায় একটু “উঃ আঃ” করতেই হচ্ছিল। তবু “এরা আসলে সিপিএমের মত সংগঠিত না তো, তাই একটু বেশি উগ্র” এসব বলে চালানো হচ্ছিল। মনোনয়ন জমা দেওয়া মিটে যেতেই ভদ্রসন্তানদের ভারী নিশ্চিন্দিভাব এসেছিল। কাগজে বেরিয়েছিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এত বেশি আসন শাসক দল কখনো জেতেনি তাই খানিকটা নিন্দেমন্দ না করে উপায় ছিল না। শিক্ষিত লোক হিসাবে সমাজে একটা পরিচিতি আছে তো। এরপর তো নির্বাচন আর নির্বাচনে তো মারামারি, বোমাবাজি, খুন হয়েছে অনেক। অতএব ওতে সরকারের দোষ হয় না। নিন্দে করার দায়িত্বও নেই ভদ্রজনের।
তার চেয়ে বড় কথা যে মরল সে তো হয় এ পার্টির লোক, নয় ও পার্টির লোক। তারা তো আর কারো মা, বাপ, ভাই, বোন, ছেলেপুলে নয়। পার্টি তো করে অশিক্ষিতরা, যাদের শিক্ষিতদের মত স্বার্থপর হয়ে বাঁচার সুযোগ নেই। অতএব তারা মরলে ভদ্রসন্তানের কী-ই বা এসে যায়? ও তাপসী মালিকই বলুন আর দেবু দাস, ঊষা দাসই বলুন, ভদ্রসন্তান হলে কি আর রাজনীতির মধ্যে যেত? চেতন ভগতের কথামত নিজের কেরিয়ার নিয়ে মাথা ঘামিয়ে জমাটি একখান চাকরি জুটিয়ে সক্কলের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেত। অতএব পরিবর্তনের সরকার ভাল সরকার। যতই লোক মারুক আর গণতন্ত্রের মা-মাসি করুক, ভি আই পি রোডটা কংক্রিটে আর রেলিঙে মুড়ে দিয়েছে, এত আলো লাগিয়েছে যে ছেলেমেয়েরা চুমু খাওয়ার আড়াল পাচ্ছে না, স্কুলমাস্টারগুলো কোন কাজ করত না, তাদের ঘাড়ে কন্যাশ্রী থেকে দিদিশ্রী সব চাপিয়ে দিয়ে খুব টাইট দিয়েছে। আর কী চাই? একেই তো বলে উন্নয়ন। কেন হিংসার প্রতিবাদ করতে যাবে ভদ্রসন্তান? এত উন্নয়নের বদলে নাহয় এক ভাই এক কবিকে দিলই দুটো গাল। কবিকে কে বলেছিল পার্টির লোকের মত কবিতা লিখতে? তিনি যদি ভদ্রসন্তানোচিত কাজ কোনগুলো সেটা ভুলে মেরে দেন, সেটা বুড়ো বয়সের ভীমরতি। তার জন্যে সরকারকে কেন গাল দেবে? সর্বেসর্বা মুখ্যমন্ত্রীকেই বা কেন দোষ দেবে?
তবু নয় ভেবে দেখা যেত যদি ভোটটা লোকসভা কি বিধানসভার হত। কিসের ভোট? না পঞ্চায়েতের। কী হয় পঞ্চায়েত দিয়ে? যে ভদ্রসন্তান পেটে বোম মারলেও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের তিনটে স্তর কী কী বলতে পারবে না, সেও জানে পঞ্চায়েতের কোন কাজ নেই। বামফ্রন্ট সরকার এইটে বানিয়েছিল কেবল টাকা মারার জন্যে। কী দরকার এমন ভোটের? তুলে দিলেই হয়। এই যে ক্যানিং লোকালে ভদ্রসন্তানদের বাড়ি রান্না করতে আসা, বাসন মাজতে আসা ছোটলোকগুলো তিন চারদিন কামাই দেয় পঞ্চায়েতে ভোট দেবে বলে —- এর দরকারটা কী রে ভাই? এইসব ছোটলোক গণতন্ত্রের বোঝেটা কী? পঞ্চায়েত ব্যবস্থা তো করার মধ্যে করেছে এই যে এদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে। ছোটলোকেরা অনেকে গ্রামের ভদ্রসন্তানদের টপকে প্রধান টধান হয়েছে। তা এ কি আর ভাল ব্যবস্থা রে বাপু? যেমন করেছিল পেছন পাকা কমিউনিস্টের দল, এখন ফল ভুগছে।
এ নিয়ে শহর, মফঃস্বল, গ্রাম সব জায়গার ভদ্রসন্তানেরাই একমত ছিলেন দুদিন আগে অব্দি। গোলমাল পাকালেন তাদেরই একজন। প্রিসাইডিং অফিসার হয়েছেন ভাল কথা, “আগেও হয়েছে” মন্ত্র জপে বুথে গিয়ে চোখকান বুঁজে থাকলেই চুকে যেত। কিন্তু এই চরম নীতিহীনতার যুগেও থাকে কিছু কিছু নীতিবাগীশ বোকার হদ্দ। এরা ভাবে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে ওঠাটা শিক্ষকের কাজের মধ্যে পড়ে। এই ভদ্রলোক সম্ভবত ঐ দলে। এই ধরণের লোকের সমস্যা হচ্ছে মেরুদণ্ড বলে জিনিসটা এখনো নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয়নি আমাদের মত। ফলে সাহসটা অসম্ভব বেশি। লাঠিসোটা, টাঙ্গি, বন্দুক — যা-ই দেখাও না কেন, এদের ভয় পাওয়ানো মুশকিল। তা শক্ত মেরুদণ্ড তো অধুনা একটি রোগবিশেষ। সে রোগে শেষ অব্দি যা হয় তাই হয়েছে আর কি। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি চমকপ্রদ। দৃশ্যত মার খেলেন এস ডি ও, তবে আসলে চড়চাপড়গুলো কার উদ্দেশে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এবং প্রত্যেকটি চড় তিনি অর্জন করেছেন।
মাস্টারমশাইয়ের মৃত্যু অনেক ছাত্রকে জাগিয়ে তুলেছে দেখে ভাল লাগছে। এই দারুণ দুঃসময়ে আমরা এতই দ্বিধাবিভক্ত যে ডাক্তার মার খেলে শুধু ডাক্তাররা প্রতিবাদ করেন, রাজনৈতিক কর্মী মার খেলে শুধু তার দলের লোকেরাই প্রতিবাদ করে, শিক্ষক মার খেলে শুধু শিক্ষক সমিতি প্রতিবাদ করে, ছাত্ররা মার খেলেও সেটা শুধু তাদের সমস্যা, সাংবাদিক মার খেলে… যাকগে। কথা হচ্ছে এই ব্যাপারটা শাসকও বুঝে ফেলেছে। ফলে প্রতিবাদীদের গায়ে একটা লেবেল সেঁটে দেয়। জানে ঐটে করে দিলেই তারা আর কারো থেকে কোন সহানুভূতি, সমর্থন পাবে না। এবারে যেমন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সরকার লেবেল দিয়েছে “ওরা তো ভোটকর্মী নয়, শিক্ষকও নয়। ওরা এবিটিএ।” কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যেমন বলে আর কি “ওরা তো ছাত্র নয়, ওরা বামপন্থী ছাত্র”, “ওরা তো কৃষক নয়, ওরা সিপিএমের কৃষক” বা এদের সব্বাইকে একেবারে থার্ড ব্র‍্যাকেটে পুরে “ওরা এন্টি ন্যাশনাল।” অস্যার্থ কেবল এটা নয় যে ঐ লেবেলের লোকেদের প্রতিবাদের অধিকার নেই। লেবেলটা আসলে চোখ মটকে বাকিদের বলা “এদের সাথে যোগ দিও না।” আমরা ভদ্রসন্তানেরাও এমন সুবোধ বালক যে সরকারী মতটা বুলির মত আউড়ে শুধু নিজে চেপে যাই তা নয়, অন্যকেও বোঝাই।
ভদ্রসন্তানদেরই আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি কিনা, তাই তেনারা যা মনে করেন সেই মতটাই প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে জঘন্যতম কান্ডগুলো করেও সরকারগুলো দিব্য “আগেও হয়েছে” বলে চালিয়ে যাচ্ছে।
— নির্বাচনের জন্যে খুন? আগেও হয়েছে।
— ধর্ষণ? আগেও হয়েছে।
— ঘোড়া কেনাবেচা? আগেও হয়েছে।
— বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পুলিশের অত্যাচার? আগেও হয়েছে।
মোদীর আছে “কংগ্রেস কে সত্তর সাল” আর দিদির “বামফ্রন্টের চৌত্রিশ বছর”। যদ্দিন উনি আরো সত্তর বছর আর ইনি আরো চৌত্রিশ বছর শাসন না করছেন তদ্দিন চুপটি করে থাকতে হবে। ভদ্রসন্তানরা অবিশ্যি চুপ করে থাকতে ভারী ভালবাসেন। জেগে উঠে একেকজন যা সব সমাধান দিচ্ছেন তাতে মনে হয় এর চেয়ে ঘুমোলেই বুঝি ভাল ছিল। সেদিন ভোট দেব বলে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি (সকাল সকাল গেছিলাম বলে দিতে পেরেছি, ভাইসব। আমায় মেডেল দিও), কর্তব্যরত পুলিশকর্মীর সাথে আমার পেছনের ভদ্রসন্তান দেশ, জাতি, পরিস্থিতি নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা শুরু করলেন এবং দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত করলেন “ভোট অনলাইন করে দেয়া উচিৎ।” আদ্ধেক লোক কী দিয়ে ভাত খাবে তার ঠিক নেই, উনি অনলাইনে ভোট করাচ্ছেন। এবং এতদ্দ্বারা শাসক দলের বদমাইশিকে বেমালুম অস্বীকার করছেন। আসলে সেই যে আগন্তুক ছবিতে ছিল — কূপমণ্ডূক। আজকাল ভদ্রসন্তানেরা স্মার্টফোনমণ্ডূক। নিজের প্রতি ছাড়া আর কারো প্রতি কোন দায়দায়িত্ব নেই। রাজকুমার রায়ের মৃত্যুটা বড় চমকে দিয়েছে, বড় কাছের লোক মনে হচ্ছে। তাই দুদিন একটু রাগারাগি করবেন আর কি। তারপর আবার মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগাবেন। তার উপরে লেখা থাকবে “আগেও হয়েছে”, এবং যেদিন সরকার দয়া করে ভোট দেয়ার সুযোগ দেবে সেদিন সুড়সুড় করে গিয়ে আবার ওদেরই ভোট দেবেন।
অবশ্য সব ভদ্রসন্তানই এমনধারা তা বললে অন্যায় হবে। অনেকে খুব প্রতিবাদী। তেনারা জেগে উঠেই ঠিক করে ফেলেছেন এদের আর ভোট নয়। কারণটি ভারী মজার। “এসব খুনোখুনি মারামারি করছে মুসলমানরা। বিজেপি এলেই এরা সিধে হয়ে যাবে। অতএব বাংলায় বিজেপিকেই চাই।” এদের জিজ্ঞেস করুন “হ্যাঁ দাদা, অনুব্রত মন্ডল কি মুসলমান? জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কি পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েন?” এনারা বুদ্ধিমানের মত জবাব দেবেন “আরে এরা তো আর মারামারিটা করছে না। যারা করছে তাদের নামগুলো দেখুন না। বেশিরভাগ মুসলমান। আরাবুলকে ভুলে যাচ্ছেন?” তখন যদি ধরিয়ে দেন যে যারা মার খেয়ে মরছে তাদের মধ্যেও অনেক মুসলমান, অমনি আপনি এন্টি ন্যাশনাল হয়ে যাবেন। আসল কথা সেই যে ব্রিগেডের মাঠে ২০১৪ সালে মোদীজি এসে বলেছিলেন “এখানে মমতা দিদি আছেন খুব ভাল কথা। দিল্লীতে আমায় বসান, আপনাদের দুই হাতে লাড্ডু হয়ে যাবে।” তা সেই লাড্ডু এখন গোগ্রাসে গিলছি আমরা। দু হাতের লাড্ডুতে মন ভরছে না, কোঁচড়েও চাই। তাই আবার নবান্নেও বিজেপিকে দরকার।
খান ভদ্রসন্তানগণ, পেট পুরে খান। পেটপুরে খান আর প্রাণভরে মলত্যাগ করুন। আপনারা তো আর ছোটলোক নন যে মাঠেঘাটে যেতে হবে। মোদীর স্বচ্ছ ভারত আর দিদির নির্মল বাংলার তো আপনারাই ব্র‍্যান্ড এম্বাসেডর।

বিঃ দ্রঃ তৃণমূল কংগ্রেসের কে এক অর্বাচীন এম এল এ কাল দাবী করেছেন তিনি নাকি এমন সন্ত্রাস বাম আমলেও দ্যাখেননি। ওসব গুজবে কান দেবেন না। লাড্ডু খেয়ে যান।

এপাশে ওপাশে

হোক সংযুক্তি

মাত্র আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেল জোয়ান বনাম বুড়োতে। এরকমই একটা কিছু আশঙ্কা করছিলাম। কেন? সে কথায় পরে আসছি। আগে মেট্রো, বাস, ট্রেনে আমার গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার কিছুটা বলি। তাতে এই “বুড়ো মানেই বদ” স্টিরিওটাইপটার অন্তঃসারশূন্যতা কিছুটা বোঝা যাবে।

এপাশে ওপাশে

এসব কী?

পশ্চিমবাংলায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়া নিয়ে যা হচ্ছে তাতে দেখছি অনেক বামবিরোধীও এখন স্বীকার করছেন এমনটা তাঁরা কখনো দ্যাখেননি। অনেকে এও বলছেন যে এমন পরিবর্তন তাঁরা চাননি। ব্যক্তিগতভাবে এসব দেখে আমি যেমন ক্রুদ্ধ, কষ্ট পাচ্ছি তেমনি একটা মৃদু ভাল লাগার জায়গা এইটা যে দেখতে পাচ্ছি বাম দলগুলোর মধ্যে, সিপিএমের মধ্যে এখনো বহু মানুষ আছেন যাঁরা প্রাণের মায়া, মান সম্মানের মায়া ত্যাগ করে প্রতিরোধ করছেন। রঙ বদলে ফ্যালেননি বা আমার মত ফেসবুকিশ বামপন্থী হয়ে যাননি।
সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়ায় যা দেখছি তাতে এটা দেখেও অবাক হচ্ছি বলা যায় যে মার বেশি খাচ্ছেন বামেরাই, বিজেপি নয়। পার্টি অফিস বা ঘরবাড়ি ভাঙচুরও বামেদেরই বেশি হচ্ছে, যারা নাকি প্রধান বিরোধী নয়। বাম রাজনীতির দিক থেকে দেখলে এই মার খাওয়া, লড়ে যাওয়া প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে। ভোট হলে তেমন কিছু বেশি আসন পাব না জেনেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্যে এরকম দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে পারে কটা পার্টি?
এসব ভাল লাগছে। কিন্তু একদমই ভাল লাগছে না যখন দেখছি সিপিএম কর্মীরা মমতার বিরুদ্ধে লড়াই চলছে বলে বিজেপির সাথে লড়াই নেই বলে ধরে নিচ্ছেন। সত্যি কথা বলতে নেতৃত্বের দিক থেকে এমন সামান্যতম ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। কোন কোন এলাকায় দেখতে পাচ্ছি বা শুনতে পাচ্ছি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে “বাম-বিজেপি সমর্থিত”, এমনকি “বাম-তৃণমূল সমর্থিত” কাঁঠালের আমসত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছে। সেরকমটা একেবারে স্থানীয় স্তরে, একজন বা কয়েকজনের স্বার্থের খাতিরে অতীতেও হয়েছে শুনেছি। এখন যখন পার্টি দুর্বল, ২০১১ র পর থেকে কেষ্টেতর প্রাণীদের অত্যাচারে অনেক জায়গায় প্রায় উধাও তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারো কারো এরকম কান্ড ঘটিয়ে ফেলা অন্যায় হলেও অবাক করার মত নয়। আদর্শগত দেউলিয়াপনা যে আছে সে তো আর আমরা নতুন জানছি না, তা বলে সকলেই ওরকম তা ভাবারও কারণ নেই। সেইজন্যেই ওরকম জোট করাটাই সামগ্রিকভাবে পার্টির অঘোষিত নীতি বলে মনে করার কারণ আছে, এমনটা নিখাদ তৃণমূলী ছাড়া কেউ বলবেন মনে হয় না। ফলত আমার আপত্তির জায়গা অন্য।
এখন গ্রাম, শহর সর্বত্রই হোয়াটস্যাপ আর ফেসবুকের দাপট। রাগ হচ্ছে, শঙ্কিত হচ্ছি তখন যখন দেখছি বিজেপি আই টি সেলের তৈরি ভুয়ো খবর সম্বলিত বার্তা সিপিএম সদস্য, সমর্থকরা দিব্যি ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছেন। ফেসবুকেও দেখছি অনেক সিপিএম সদস্য সরাসরি শেয়ার বাটন টিপে বিজেপি এবং তার বন্ধু যে দাঙ্গাবাজ সংগঠনগুলো, তাদের পোস্ট শেয়ার করছেন। সেসব পোস্টের মধ্যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষী, বানানো তথ্যসম্বলিত যে পোস্টগুলো আমরা অনেকেই চিনি, সেগুলোও রয়েছে। মমতা কত খারাপ তা প্রমাণ করার জন্যে এসবও যাঁরা শেয়ার করছেন তাঁদের ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই। মমতা কত খারাপ তা অনেকেই বুঝতে পারছে। আপনারা বিজেপির ভাষা ধার করে না বোঝালে লোকে বুঝবে না?
যেসব মানুষ বুক চিতিয়ে এখনো নিজেদের সিপিএম সমর্থক বলেন তাঁদের এহেন কার্যকলাপ দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। এমনও সন্দেহ হচ্ছে যে তাঁদের সমর্থন বস্তুত একটাই চিহ্নে বরাবর ভোট দিয়ে আসার অভ্যাস, দলটার নীতি বা আদর্শের প্রতি (আদর্শ শব্দটায় আপত্তি থাকলে কথিত আদর্শ বলা যাক) সমর্থন নয়।
তবু সেটা সমর্থকদের ব্যাপার। একজন সমর্থকের সব কিছু তো আর একটা দল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দল অন্তত তার সদস্যদের শাসন করুক। সি পি আই (এম) এর কোন সোশাল মিডিয়া সেল আছে কিনা আমার জানা নেই। যদি নাও থাকে, এসব যে পার্টি সদস্যরা করছেন তাঁরা বুঝে করছেন, না না বুঝে করছেন সে দিকে নেতৃত্বের নজর দেওয়া উচিৎ নয় কি? নইলে তো ধরে নিতে হবে “মৌনং সম্মতি লক্ষণম।” বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটাই যে বড় লড়াই সে কথা তো আপনাদের পার্টি কংগ্রেসও স্বীকার করল। তাহলে এসব কী?

এপাশে ওপাশে

সব ধর্ষণ সমান নয়

কথাটা অনেকদিন ধরেই লিখব লিখব করছি। কিন্তু এমনও কথা আছে যা লিখতে হাত সরে না। কেবলই মনে হয় “ভুল ভাবছি। এ সত্যি নয়।“ কিন্তু নিজেকে এ হেন প্রবোধ দিয়েই বা কতদিন চলে?

এপাশে ওপাশে

খরচের খাতা

যারা পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার জন্যে গুন্ডামি হচ্ছে বলে চেঁচামেচি করছে তারা বুঝছে না এর মাধ্যমে কত পয়সা বাঁচছে। একটা এতবড় নির্বাচন করতে কত খরচা হয় বোঝেন? বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন হয়ে গেলে কত টাকা বেঁচে যাবে সে খেয়াল আছে? চৌত্রিশ বছরে বামফ্রন্ট তো কোষাগার খালি করে রেখে গেছিল। তা সত্ত্বেও বাংলায় যে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে এরা কি সেটা দেখতে পাচ্ছে না?
ক্লাবগুলো সব ঝিনচ্যাক নীল সাদা হয়েছে, রাস্তায় এত আলো যে পাখিরা রাতে দিন ভেবে কলকাকলিতে ভরিয়ে দিচ্ছে, ভি আই পি রোড, যশোর রোড সব কালীঘাট মন্দিরের চাতালের মত চওড়া হয়ে গেছে, গাছফাছ উড়িয়ে দিয়ে রেলিং বসিয়ে লন্ডন না হোক, কলকাতাকে হনলুলুর মত তো দেখাচ্ছেই। নইলে বিদেশ কিম্বা ব্যাঙ্গালোর থেকে অনেকবছর পর এসে বিশ্ব বাঙালিরা আনন্দে কেঁদে ফেলছে কি এমনি এমনি? গ্রামে লোকজন চৌত্রিশ বছর ধরে খেতে পেত না, পরতে পেত না, পড়তেও পেত না। কারণ স্কুল কলেজ কিছু ছিলই না। এখন ইস্কুলে ইস্কুলে ছয়লাপ। সেসব সহ্য হচ্ছে না বলে হিংসুটে সিপিএম কাগজগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে রটাচ্ছে যে সরকারী ইস্কুলগুলো নাকি উঠে যাচ্ছে। তা সে রটাক। নিন্দুকের রাবণের মত দশটা মাথা হয়। কিন্তু এটা তো বুঝতে হবে এত উন্নয়ন করতে টাকা লাগে। সে টাকা কি আকাশ থেকে পড়বে? বছর বছর ভোটও হবে আবার উন্নয়নও হবে? এ যে খেতে পেলে শুতে চাওয়া দেখছি।
আর ভোট দিতে গেলেই বা দিতেন কাকে? লালেদের তো আর দিতেন না এই বাজারে। আর আছেটা কে? জয় শ্রীরাম পার্টি? আরে জয় শ্রীরাম তো তরোয়াল হাতে নিয়ে যারা মনোনয়ন জমা দেয়া আটকাচ্ছে তারাও বলছে। তবে আর তফাত কী? তাহলে দাঁড়াল কী? দাঁড়াল এই যে ভোট হলেও যাকে দিতেন ভোট না হলেও সে-ই জিতবে। তাহলে আবার অসুবিধেটা কী? খামোকা এক কাঁড়ি টাকা খরচা করার থেকে এইটেই ভাল না? ভাত, ডাল আর ডিমের ঝোলের উপর দিয়ে মিটে যাবে।
কী বললেন? হিংসা? রক্তপাত? ধুর মশাই! ও তো বাম আমল থেকে চলে আসছে। এতটা দ্যাখেননি বলছেন? ওসব চক্রান্ত। চুপিচুপি করেছে, ক্যামেরায় উঠতে দেয়নি। এখনকার সরকার অনেক খোলামেলা, গণতান্ত্রিক। তাই সব দেখতে পাচ্ছেন আর ভয় পাচ্ছেন। এই যে ভয় পাওয়ার স্বাধীনতা — এইটাই তো আগে ছিল না। এটাই তো সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তাছাড়া হিংসা হচ্ছে হিংসা। পাঁচ কোটি চুরি কল্লেই চুরি আর পাঁচ টাকা চুরি কল্লে চুরি না? যত্তসব মাওবাদীর দল! সিপিএম এর ম, মাও এর ও আর বিজেপির পি র কা মিলে হল মওকা। এরা ভেবেছে এই মওকা ক্ষমতা দখল করে উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করে দেয়ার। সে গুড়ে বালি। উন্নয়ন চলছে, চলবে।

বিঃ দ্রঃ বিজেপিতে কা নেই সেটা আমরা জানি। বাম বুদ্ধিজীবীদের ভাষার উপর প্রভুত্ব করার স্বভাবটা আর গেল না। ভাষাটা এখন আর রবীন্দ্র সদনের আঁতেলদের নয়, ওটা এখন সবার। অতএব আমরা যখন বলেছি কা আছে তখন আছে। ও নিয়ে দাঁড়কাকের মত কা কা করবেন না বলে দিচ্ছি।

এপাশে ওপাশে

নিজের দিকে আঙুল তুলুন

যেহেতু প্রাসঙ্গিক সেহেতু একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করা যাক।
আমার বাড়ির খুব কাছে অধুনালুপ্ত হিন্দমোটর কারখানা, তৎসহ শ্রমিকদের কোয়ার্টার। ঐ এলাকার বাইরেও কিছুটা জায়গা জুড়ে যাঁদের কোয়ার্টারে জায়গা হয়নি বা নিজের সামর্থ্য আছে তাঁদের বাসস্থান। আমার যখন সদ্য অক্ষর পরিচয় হয়েছে তখন কারখানাটা রমরমিয়ে চলছে। আমার বাবা সেইসময় সক্রিয় রাজনীতিবিদ, তার উপরে প্রশাসক। ফলে রোজ সকালে ঐ কারখানার শ্রমিকরা, যাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসেছেন এবং মূলত হিন্দিভাষী, বাবার কাছে বিভিন্ন দরকারে আসতেন। বাবা বাড়ি ফিরত অনেক রাত করে, ফলে খুব ভোর ভোর উঠতে পারত না। যতক্ষণ না উঠত, ওঁদের সাথে গল্পগুজব করতাম আমি। অন্য ভাষা আমার কাছে ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক ছিল আর ওঁদের দিক থেকে দেখলে, ছোটদের সাথে সময় কাটাতে কার না ভাল লাগে?

এপাশে ওপাশে