Tags » এপাশে ওপাশে

অবিনয় নিবেদন

এবছর বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন, আবার মোদীজি ধুয়ো তুলেছেন সব নির্বাচন একসাথে করা ভাল। এরাজ্যে আবার সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। অতএব যেটা না করলে বিজেপি ভোটে জিততে পারে না সেটা তো করতেই হবে। শুরু হয়ে গেছে তার প্রচেষ্টা — দেশজুড়ে। সঙ্ঘ পরিবারের হিংসাত্মক আদর্শের কথা বাদ দিলেও, কর্মসংস্থানের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে যেখানে গুজরাটেই গদি টলে গেছিল, সেখানে বাকি ভারতে যে দাঙ্গা ছাড়া জেতা শক্ত সেটা নরেন্দ্র আর অমিত ভালই বোঝেন। সুতরাং পুরনো পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে।
কাসগঞ্জে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ঝামেলা পাকিয়ে, মুসলমানদের দেশদ্রোহী সাজাতে গিয়ে দুটো মানুষের প্রাণ গেল — কুছ পরোয়া নেই। যত দিন যাচ্ছে, ততই প্রকাশ পাচ্ছে কাসগঞ্জের ঘটনাটা যা বলে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছিল, ব্যাপার ঠিক তার উলটো। মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও যে সেগুলো রিপোর্ট করতে হচ্ছে তার অনেকটা কৃতিত্ব দাবী করতেই পারে সোশাল মিডিয়া। বিভিন্ন লোকের তোলা ঐ দিনের ভিডিও সেখানেই ভাইরাল হয়ে গেছে প্রথমে।
কিন্তু সামনে যেখানে এতগুলো নির্বাচন সেখানে সঙ্ঘ পরিবারের আই টি সেল বসে থাকবে কেন? উত্তরসত্যের সুবিধা হল একবার যা বলা হয়ে গেছে, সেটা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও বারবার ফরোয়ার্ড করে মিথ্যাটাকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বুকের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ঘৃণাই সেটাকে সত্য বলে মেনে নেয়। ফেসবুকে তাই গত কয়েকদিন ধরে কাসগঞ্জ নিয়ে সমানে মিথ্যাচার চলার পাশাপাশি দেখছি হোয়াটস্যাপে ছড়ানো হচ্ছে চরম অসত্য, মুসলমানবিদ্বেষী বেশকিছু বার্তা। তারমধ্যে কিছু একেবারে ভিত্তিহীন, গা ঘিনঘিন করা এবং অতিপরিচিত বোকা বোকা কথা সম্বলিত। যেমন কলকাতার বিশেষ বিশেষ এলাকায় এত অস্ত্র মজুত আছে যে যে কোনদিন ১৯৪৬ এর মত দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং শুরু হয়ে যাবে। আবার কিছু বার্তা সত্যের সঙ্গে মিথ্যে মিশিয়ে এক অদ্ভুত মিশেল। সেখানে বদমাইশিটা এত সূক্ষ্ম যে সাধারণ লোকের পক্ষে ধরতে পারাই শক্ত, বিশ্বাস করে ফেলা সহজ। একটা বার্তায় যেমন দেখলাম শ্রীচৈতন্যকে ইসলামের দালাল প্রমাণ করা হয়েছে।
এসব বার্তা অনেকেই পাচ্ছেন, যত দিন যাবে আরো পাবেন। সেসবের পুনরাবৃত্তি করা আমার এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য আমার যেসব বন্ধু, সহকর্মী, পরিচিত এসবে বিশ্বাস করেন এবং ফরোয়ার্ড করেন তাঁদের একাদিক্রমে জানিয়ে দেওয়া যে এরপরে আপনার থেকে ওরকম কিছু পেলে সোজা কলকাতা পুলিসে রিপোর্ট করব। আপনি কে, আপনার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক না পেশাগত সম্পর্ক, আপনি লোকটা পাতে দেওয়ার যোগ্য না হলেও আপনার স্ত্রী/স্বামী নিপাট ভালমানুষ কিনা ওসব আর আমি দেখব না। “Forwarded as received” এর চালাকি আপনার রক্ষাকবচ হতে পারে কিনা সেটা তারপরে আপনি বুঝবেন আর পুলিস বুঝবে।
এভাবে ফেসবুকে পোস্ট করলাম কারণ অনেকবার লক্ষ্য করে দেখেছি ব্যক্তিগতভাবে “আমাকে এসব পাঠাবেন না। পছন্দ করি না, একমত নই। আর পাঠালে সম্পর্ক রাখব না” বলে কোন লাভ হয় না। বোধহয় যাকে বলি সে ভাবে “এতদিনকার সম্পর্ক। ও বলছে ঠিকই, কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারে ওরকম করবে না।” কিন্তু ব্যাপারটা আমার কাছে সামান্য নয়। আর এইমুহূর্তে এই ঘৃণা ছড়ানোর ফলে এদেশে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। অতএব যা ফরোয়ার্ড করবেন তার ফল ভোগ করতে তৈরি থাকলে তবেই ফরোয়ার্ড করুন।

সঙ্গে রইল কাসগঞ্জ নিয়ে আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন

এপাশে ওপাশে

সীতারামায়ণ

মার্কসবাদ মানে কী, সীতারাম ইয়েচুরি যা বলছেন সেটাই কিনা, প্রকাশ কারাত ঠিক না ভুল — এসব তত্ত্বকথা না হয় থাক। তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করার বৈদগ্ধ্য আমার নেই, যতদূর জানি বেশিরভাগ লোকেরই আমার মতই অবস্থা। অতএব ওসব ভুলে গিয়ে একটা কান্ডজ্ঞান সংক্রান্ত প্রশ্ন করি। কান্ডজ্ঞান ব্যাপারটা সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায়শই গাণিতিক। অতএব প্রশ্নটাকে অঙ্কের প্রশ্নও বলা যায়। প্রশ্নটা এই — যে অঙ্কটা একবার ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে সেটাই আবার করতে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ কিনা।

পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের জোট নিদারুণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আসন সংখ্যাটা যেসব সিপিএম কর্মীর মনে আছে তাঁরা নিশ্চয় মানেন একা লড়লে ৩৪ বছরের শাসন বা অপশাসন সত্ত্বেও এত খারাপ অবস্থা হত না। অর্থাৎ ইয়েচুরি, কারাত, বেঙ্গল লাইন, কেরালা লাইন যা-ই হোক না কেন হাতে কাস্তে হাতুড়ি উঠে আসা ভোটাররা মোটেই পছন্দ করেননি। সীতারামের একমাথা চুল বলেই তিনি আবার বেলতলায় যাবেন এটা কী ধরণের কান্ডজ্ঞান ভগবান কিম্বা মার্কস কেউই জানেন না বোধহয়।

আজকের টাইমস অফ ইন্ডিয়া পড়ে বুঝলাম ভদ্রলোকের আবার পার্টির উপর অভিমান হয়েছে। “আমায় প্রো কংগ্রেস বললে আমিও প্রো বিজেপি বলতে পারি” জাতীয় ছেলেমানুষি কথাবার্তা বলেছেন ধেড়ে সাধারণ সম্পাদক। সে বলুন গে। উনি বুঝবেন আর ওঁর পার্টি বুঝবে। কিন্তু উনি মার্কসবাদের মানে যা বলেছেন সেটা মেনে নিলেও যে কংগ্রেসের সাথে জোট সমর্থনযোগ্য হচ্ছে না! উনি বলেছেন যে বদলাতে পারে না সে কমিউনিস্ট নয়। মেনে নেওয়া গেল। তাহলে উনি নিজে কংগ্রেসের সাথে জোটের চূড়ান্ত ব্যর্থতা দেখার পরেও বদলাচ্ছেন না কেন?

ক্ষমতা থেকে বিজেপিকে তাড়ানো যে আশু কর্তব্য তা নিয়ে শুধু সিপিএম বা বামপন্থী কেন, বিরোধী রাজনৈতিক দল বা দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিকদের কারোরই দ্বিধা আছে বলে মনে হয় না। সীতারাম নিজেও বলেছেন মতপার্থক্য শুধু কিভাবে সেটা নিয়ে। তাহলে কেন মনে হচ্ছে যে বিরোধী ঐক্যটা নির্বাচনী জোট করেই হতে হবে? ভোটের পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী তো সিদ্ধান্ত নেওয়াই যায়। সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়াই তো নির্বাচন দিয়েই শেষ হবে না।

তেলে আর জলে মিশ খাওয়াতে গেলে যে যাকে হারাতে চাইছি তারই সুবিধা হয় সেই শিক্ষাটা ২০১৬ র ফল থেকে নেওয়া কি এতই শক্ত? আমরা কেউ কি ভুলে গেছি বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে মমতা কী বলে গেলেন সমানে? কংগ্রেস সমর্থকদের বললেন “দেখুন, বরাবর বলেছি কংগ্রেস সিপিএমের বি টিম। দেখলেন তো? ওরা সাঁইবাড়ির শহীদদের কেমন ভুলে গেল দেখুন।” আর বাম সমর্থকদের ছুঁয়ে গেল তাঁর টিটকিরি “বাহাত্তরের সন্ত্রাস ভুলে গেলেন কমরেড?” এর ফলে যেটা হল সেটা হচ্ছে গোটা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে পাঁচ বছর কী কাজ করলেন তার কোন হিসাবই দিতে হল না। বিরোধীরা নিজেদের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকলেন, সরকারকে প্রশ্নটা করবেন কখন?

এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়, রামধনু জোট হলে নরেন্দ্র মোদীর কাজটাও একইরকম সহজ হয়ে যাবে। অর্থনীতির বেহাল অবস্থার জন্যে জবাবদিহি করতে হবে না, সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পুঁজিবাদের জন্যে কৈফিয়ত দিতে হবে না, কর্নিসেনাদের তোল্লাই দেওয়া, মুসলমান, দলিতদের উপর অত্যাচারের প্রশ্ন উঠবেই না। তিনি শুধু কেঁদেকেটে মিটিঙে মিটিঙে সেই ফাটা রেকর্ড বাজাবেন “মিত্রোঁ, আপনারা দেখুন, আমি দলিত বাবা-মার চা ওয়ালা ছেলে, আপনাদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় এসেছি। আমাকে সরানোর জন্যে সবাই একজোট হয়েছে। এদের কোন নীতি নেই, কোন আদর্শ নেই, শুধু একটাই উদ্দেশ্য — মোদীকে হারানো। কারণ মোদী গরীব মানুষের জন্যে কাজ করে, কারণ মোদীর আমলে হিন্দুদের জাগরণ হয়েছে” ইত্যাদি। এর সাথে মোদীর ইশারায় সাঙ্গোপাঙ্গদের তৈরি কিছু বাইনারি তো থাকবেই, সেগুলো তো জোট হলেও হবে, না হলেও হবে। অর্থাৎ বিরোধীরা যথারীতি নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবেন। বরং মোদীর পক্ষে তুলনায় শক্ত হবে যে রাজ্যে যে শক্তিশালী সেখানে তার মোকাবিলা করা। কারণ ২০১৪ র হাওয়া আর নেই। সব প্রশ্নপত্রের একই উত্তর দিয়ে তখন ড্যাংড্যাং করে পাশ করা গেছিল, এবারে অত সোজা হবে না। অতএব আমি যদি মোদী হতাম, আমি চাইতাম শুধু কংগ্রেস-বাম নয়, যত বিরোধী দল আছে সব্বাই মিলে একটা জোট হোক। তাহলে বলতে পারব সারদা, নারদা, ভাদরা, কাস্তে, হাতুড়ি সবাই এক। এরা এক হয়ে দেশের মানুষকে লুটতে চায়। এটা এন্টি ন্যাশনালদের জোট। অর্ণব গোস্বামীকে লেলিয়ে দেব, সে জিওর্জিও আরমানির স্যুট আর জিমি চুর জুতো পরে বলবে “এটা দেশের গরীব মানুষের ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় ফিরতে হাত নিশপিশ করা লুটিয়েন্স এলিট আর জেএনইউ এর এন্টি ন্যাশনাল বামেদের জোট। এতদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ছিল, এবার ভোটে হয়েছে।” আহা! ভারী মজা হবে।

অনেক বাজে বকলাম। একটা মজার স্মৃতি দিয়ে শেষ করি।

জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে যখন তাঁর পার্টিতে বিতর্ক হয় তখন সীতারাম ইয়েচুরি ছিলেন সরকারে না যাওয়ার পক্ষে। সেবারে তাঁরাই জয়যুক্ত হয়েছিলেন। তারপর আজকালে একটা ছবি বেরিয়েছিল। ছবি মানে এখন যাকে মিম (meme) বলা হয়। ছবিতে কার্ল মার্কসের মূর্তির সামনে বসে সীতারাম বোঝাচ্ছেন “মার্কসবাদ মানে হল…”। আর মার্কসের মূর্তিটা বলছে “এটা আবার কে?”

এপাশে ওপাশে

ধর্মনিরপেক্ষতার ধাঁধা

আগামী বছর লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার ৩০ বছর পূর্ণ হবে। এই তিরিশ বছরে দুটো শব্দবন্ধ আদবানি এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের কল্যাণে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে — মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা (pseduo secularism) আর প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা (true secularism)। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের হজযাত্রায় ভর্তুকি তুলে দেওয়ার সূত্রে ঐদুটো শব্দবন্ধ আবার বেশি বেশি করে শোনা যাচ্ছে। মোটের উপর বিজেপি এবং তার সমর্থকরা যা বলছেন তার সার এই যে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে একটা বিশেষ ধর্মের লোক তীর্থ করতে যাবে বলে সরকার পয়সা খরচা করবে কেন? 34 more words

এপাশে ওপাশে

আমি আজ উদ্বাস্তু বটে

আসামে বিনাগরিকীকরণ (disenfranchisement) প্রক্রিয়া হৈ হৈ করে শুরু হয়ে গেছে। শুনছি বাতিলের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্যও আছেন। ব্যাপারটা মোটামুটি বাঙালি খেদাও হয়ে দাঁড়াচ্ছে আবার। “মুসলমান হলে বাঙালি নয়”, “বাঙালিরা কিসের ভারতীয়” এসব কথাবার্তা সঙ্ঘচালিত ভারতে প্রায়ই শুনছি। অনেক হিন্দু বাঙালিরও প্রথম বাক্যটা খুব পছন্দের। নির্ঘাৎ আসামের অনেক হিন্দু বাঙালিও “বিজেপি এলে মুসলমানদের তাড়াবে” এই আনন্দে তাদের ভোট দিয়েছিলেন, এখন দেখছেন ভটচায্যি বামুনের ছেলে তপোধীর, তারও নাগরিকত্ব এরা কেড়ে নিচ্ছে। ফেসবুকে অনেকদিন ধরেই দেখতে পাই ‘বাংলায় বিজেপিকেই চাই’ ইত্যাদি নামে অনেকগুলো গ্রুপ বেশ সক্রিয়। আমার বন্ধুবান্ধবদের কেউ কেউও তাদের পোস্ট সহর্ষে শেয়ার করে। আশা করি এরা কেউ আমার মত বাঙাল পরিবারের ছেলে নয়। কারণ আমি আজ সকালেই ভেবে দেখলাম আমার পৈতৃক বাড়িটা যে ১৯৭১ এর অনেক আগে তৈরি সেটা প্রমাণ করা বেশ দুঃসাধ্য হবে। দাদুর আমলের দলিল কোথায় আছে, আদৌ আছে না উইয়ের পেটে গেছে সে খুব শক্ত প্রশ্ন। আবার থাকলেও দিলীপ ঘোষের সরকার সেটাকে প্রমাণ বলে মানবে কিনা তা-ই বা কে জানে?

কাল আবার আসামের মুখ্যমন্ত্রী জোর গলায় বলেছেন যাদের ১৯৭১ এর আগে আসামে বাস ছিল বলে প্রমাণ হবে না তাদের কোন নাগরিক অধিকার থাকবে না। উদ্বাস্তুর যেটুকু মানবাধিকার সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ স্বীকার করে সেটুকুই থাকবে। এখন কথা হচ্ছে, একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কে অধিকার দিয়েছে কে দেশের নাগরিকই নয় সেটা নির্ধারণ করার? ১৯৭১ এর আগে আসামে থাকত না মানেই ভারতে থাকত না তা তো না-ও হতে পারে। কিন্তু এসব যুক্তির কথা। যুক্তিফুক্তি হিন্দুরাষ্ট্রে চলে না। অতএব যারা যারা বাঙাল এবং বাংলায় বিজেপিকে চাও, সবাই এখন থেকে প্রমাণ যোগাড় করতে লাগ নইলে আমার মত পাপিষ্ঠ বামপন্থীর সাথে একসাথে রিফিউজি হয়ে যেতে হবে কিন্তু। আর সে রিফিউজি মানে অভিষেক বচ্চন নয়, মেঘে ঢাকা তারার বিজন ভট্টাচার্য। মনে থাকে যেন। মনে না পড়লে ইউটিউবে একবার দেখে নাও, বাবারা।
পুনশ্চ: বামফ্রন্ট সরকারের যতরকম সমালোচনা হওয়া সম্ভব এবং হয়, তারমধ্যে মরিচঝাঁপি থাকেই। অন্য বামপন্থীদের সমালোচনাতেও থাকে, বিজেপির মত দক্ষিণপন্থীদের সমালোচনাতেও থাকে। মরিচঝাঁপিতে যারা নিহত, ধর্ষিত, বিতাড়িত হয়েছিল তারা মুসলমান ছিল না, বেশিরভাগই ছিল হিন্দু। নমঃশূদ্র। বিজেপি তাহলে এতদ্বারা স্বীকার করে নিক যে মরিচঝাঁপিতে যা করা হয়েছিল ঠিকই করা হয়েছিল। অনাগরিকের আবার কিসের নাগরিক অধিকার? আর মানবাধিকার? সে তো রোহিঙ্গাদেরও আছে। তা বলে কি তাদের এদেশের মাটিতে মানুষের মত বাঁচতে দিতে হবে নাকি? অবশ্য মুসলমানদের মানবাধিকার ব্যাপারটা বিজেপির কাছে সোনার পাথরবাটি।

এপাশে ওপাশে

বড় দেশের দিন

NEW YORK, NY – DECEMBER 13: Santa Claus attends an evening hosted by Brooks Brothers to celebrate the holidays with St. Jude Children’s Research Hospital at Brooks Brothers on December 13, 2016 in New York City. 14 more words

এপাশে ওপাশে

রক্তপিপাসু বাঙালি

আখলাক আহমেদ খুন হওয়ার কয়েকদিন পরে আমি একটা খেলার প্রতিবেদন লিখতে একটা বিজেপিশাসিত রাজ্যে গেছি। সেই রাজ্যের সবচেয়ে শিল্পোন্নত শহরের অভিজাত এলাকায় তৈরি স্টেডিয়ামের অস্থায়ী প্রেস বক্সে গিয়ে রোজ বসি। ওখানকার পয়সাওয়ালা, ক্ষমতাবান লোকেরা আশেপাশেই এসে বসেন, খানিকক্ষণ ক্রিকেটমাঠের উত্তাপ নিয়ে যান, নিজেদের মধ্যে আবহাওয়া, হজমের গণ্ডগোল, ক্রিকেটটা আশির দশকে কেমন ছিল আর এখন কেমন হয়েছে, শহরের কোথায় এখন জমির দাম সবচেয়ে বেশি আর কোথায় সবচেয়ে কম — এইসব নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। সেই আলোচনায় একদিন দেখলাম সকলেই একমত হয়ে বলছেন যে একটা মুসলমান মরেছে তাতে দেশসুদ্ধু লোক মিলে যে লাফালাফিটা করছে সেটা অত্যন্ত অন্যায়। উত্তরপ্রদেশ সরকার আবার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে!

এপাশে ওপাশে

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

সকালের কাগজে দেখলাম এক বৃদ্ধকে নিয়ে একটা আবেগঘন লেখা বেরিয়েছে। হেডিংটা পড়েই মনে মনে একটা কাঁচা খিস্তি দিলাম। তারপরেই মনে পড়ল ছোটবেলায় একবার বাবার সাথে বাজারে গেছি, বাবা চায়ের দোকানে ঢুকেছে। এক অচেনা বুড়ো, দেখলেই তার জন্যে কষ্ট হবে আপনার, এক কোণে বসে চা খাচ্ছিল। চায়ের গেলাসটা মুখ অব্দি নিয়ে যাওয়াও তার পক্ষে কষ্টকর। বহুকষ্টে মুখের পেশি সঞ্চালন করে একবার বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। বাবাও হাসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম “কে গো? চেনো?”
বাবা বলল “চিনব না? একসময় এ আমাদের কম ঠেঙিয়েছে? নামকরা গুন্ডা ছিল।”
“খুনটুন করেছে নাকি?”
“ঠিক জানি না। করেও থাকতে পারে এক আধটা।”
“এখনো গুন্ডামি করে?”
“না না। এখন তো বয়স হয়ে গেছে, ভদ্রলোক হয়ে গেছে।”
গুন্ডারা বয়স হলে ভদ্রলোকই হয়ে যায় বটে। কারণ উপায় থাকে না, জোয়ান গুন্ডাদের জায়গা ছেড়ে দিতে হয়।
নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কোন বৃদ্ধের কথা বলছি? হ্যাঁ, লালকৃষ্ণ আদবানির কথাই বলছি। তিনি নাকি বাবরি ধ্বংসে আজও ব্যথিত। লেখাটা পড়লে দেখবেন সেই চিরাচরিত হিন্দুত্ববাদের যুক্তিগুলো আবার আওড়ানো হয়েছে, নতুন কিছু নেই। আর বাবরি ধ্বংস সম্পর্কে আন্দোলনের এক নম্বর নেতা বলছেন তাঁর নাকি উদ্দেশ্য ছিল শুধু প্রতীকী করসেবা করা, মসজিদ ভাঙা নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে গেছিল।
আদবানির সঙ্গে কথা বলেছেন এক প্রবীণ সাংবাদিক। অদ্ভুত ব্যাপার হল ঝানু সাংবাদিকরাও ২৫ বছর পরেও এইসব ঢপ হজম করছেন। একবারও প্রশ্ন করেননি “বাবরি ভাঙার উদ্দেশ্য যদি না-ই থেকে থাকে তাহলে ‘মন্দির ওয়াহি বনায়েঙ্গে’ স্লোগানে ‘ওয়াহি’ বলতে আপনি কোন জায়গাটা বুঝিয়েছিলেন? কল্যাণ সিং এর বাড়ির বৈঠকখানাটা? প্রতীকী করসেবায় শাবল, গাঁইতি, তরোয়াল এসবই বা আসে কোথা থেকে?”
যাই হোক, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তার অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে তরতরিয়ে এগিয়েছে গত ২৫ বছরে। লালু গুন্ডা কালের নিয়মে নরেন গুন্ডাকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভদ্দরলোক হয়ে গেছে। হিন্দুত্ববাদের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার এই যাত্রায় সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল আমাদের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। ভুলে যাবেন না। ভুলে যাবেন না নরেন্দ্র মোদী যদি হিন্দুত্ববাদের বিশ্বকাপজয়ী মহেন্দ্র সিং ধোনি হন, আদবানি তাহলে কঠিন পরিস্থিতিতে বিদেশের মাটিতে ম্যাচ জেতানো সৌরভ গাঙ্গুলি। এখন তিনি নিজেকে অময় খুরাসিয়া হিসাবে প্রমাণ করে হাত ঝেড়ে ফেলবার চেষ্টা করলেই তাঁকে সেটা করতে দেওয়া চলবে না কারণ জার্মান ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যারা ইতিহাস বিস্মৃত হয় তারা অভিশপ্ত। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তারা করবেই।” জার্মানরা আবার এই ব্যাপারটা অন্য অনেকের চেয়ে ভাল জানে। ভুক্তভোগী তো।
যাতে ভুলে না যাই, তাই রইল আনন্দ পট্টবর্ধনের তথ্যচিত্র ‘রাম কে নাম’

এপাশে ওপাশে