Tags » Environment Day

পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে অসাধারণ একটি গল্প অঙ্কিতা'র কলমে।

 কুহু ও তুষাররাজা

কুহু চোখটি বুজে মটকা মেরে পড়ে রইল বিছানায়। এমনকি ঘন্টাখানেক বাদে মা আর জ্যাম্মা যখন এসে ওদের দুটোর গায়ে চাদর টেনে, মাথায় হাত বুলিয়ে গেল তখনও কুহু টুঁ শব্দটি করেনি। দরজা বন্ধ করে মা, জ্যাম্মা চলে গেল। দরজার তলার ফাঁক দিয়ে অল্প আলো আসছিল সাথে বড়দের টুকটাক কথাবার্তার আওয়াজ। পাশেই কুহুর জেঠতুতো বোন টুপুল নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। কুহুর বেশ রাগ হল। একটু আগে সে কত প্ল্যান করল টুপুলের সাথে। কি উত্তেজনা তখন টুপুলের! আর এখন দেখ যেই কম্বলের তলায় ঢুকেছে অমনি নাক ডাকছে। পাশের ঘরের আওয়াজ আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে আসছে। একসময় জেঠুমনির হাই তোলার আওয়াজ পেল কুহু, সাথে সাথে মায়ের গলাও শুনতে পেল, “অনেক রাত হল। এবার শুয়ে পড়লেই হয়।” জ্যাম্মাও সায় দিচ্ছে মায়ের কথায়। কুহু আনন্দের চোটে বিছানায় উঠে বসল। উত্তেজনায় তার ঘুম কোথায় উড়ে গেছে। পাশের ঘর ফাঁকা হয়ে গেল আস্তে আস্তে। বিছানায় বসে বসে খুট খুট করে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পেল কুহু। টুপুলকে কি জাগাবে? টুপুলের সাথেই তো পুরো প্ল্যান হল। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেই ওরা চুপিচুপি যাবে পাশের ঘরে। সেখানেই রাখা আছে সেই পরম আকাঙ্খিত বস্তুটা। টুপুলকে বার তিনেক ঠেলা মারল কুহু। ফিসফিসিয়ে ডাকলও, “এই টুপুল ওঠ। সবাই শুয়ে পড়েছে। যাবি না?” কিন্তু কোথায় টুপুল! সে এতক্ষণে ঘুমের দেশে গিয়ে খেলনাবাটি নিয়ে বসে গেছে হয়ত। টুপুলের উপর খানিক বিরক্তি আর বাইরের ঘরের প্রতি অনেক বেশী আগ্রহ নিয়ে কুহু কম্বল সরিয়ে খাট থেকে নামল।
উহুহু কি ঠাণ্ডা রে বাবা! দরজার হাতলে হাত ছোঁয়াতেই যেন ইলেকট্রিক শক লাগল কুহুর। আগের থেকে ঘরটাও যেন অনেক বেশী ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। কুহু হাতড়ে হাতড়ে সোয়েটারটা খুঁজে বের করল। দরজায় একবার কান পেতে শুনল কেউ আছে কিনা ঘরে। নাহ্‌ সব শুনশান নিস্তব্ধ। সোয়েটারটা টেনেটুনে শরীরে গলিয়ে কুহু দরজা খুলে জেঠুমনির ফ্ল্যাটের হলঘরে পা রাখল।
নিকষ অন্ধকার আর কনকনে ঠান্ডায় কুহু কিছুই ঠাহর করতে পারল না। এত ঠাণ্ডা ডিসেম্বর মাসে কলকাতায়? এই তো সন্ধ্যাবেলা যখন মা আর জ্যাম্মা রান্নাবান্না করছিল তখনও তো কুহুর রীতিমত গরম লাগছিল। মাও বারে বারে মুখ মুছছিল রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে। জ্যাম্মা তো ঘেমেনেয়েই অস্থির। জেঠুমনি আর বাবাও আলোচনা করছিল গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যে কি করে আবহাওয়ার এত পরিবর্তন হয়ে গেল? কোথা থেকে আরেক ঝলক হাড় কাঁপানো হাওয়া বয়ে এল কুহুর দিকে। কুহু একেবারে গুটিসুটি মেরে গেল। আগের বছর শীতকালে দার্জিলিং গিয়েও এত ঠাণ্ডা লাগেনি কুহুর। হাওয়াটা যেন সোয়েটারের মধ্যে দিয়ে মাংস ভেদ করে একেবারে পাঁজরে গিয়ে ধাক্কা মারল। আর তেমনি অন্ধকার। একেবারে ঘুরঘুট্টি কালো হয়ে আছে বসার ঘরটা। কুহু বুঝতেই পারছে না সে চোখ খুলে আছে নাকি চোখ বুজে, এমনি অন্ধকার। আন্দাজে আন্দাজে দেওয়ালের দিকে হাত বাড়াল কুহু। এই পাশেই সুইচ বোর্ডটা থাকার কথা। জ্যাম্মা কি আজকে ভুল করে বাইরের ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে গেছে? অন্ধকারে খানিকক্ষণ এধার ওধার হাতড়াল কুহু। এই তো দেওয়াল, কিন্তু সুইচ বোর্ডটা খুঁজে পেল না কুহু। কি করা যায়? একটা আলো না হলে তো কিছুই করা যাচ্ছে না। কুহুর মনে পড়ল ডানদিকে হেঁটে গেলেই প্রথমে সোফা, সামনে সেন্টার টেবিল আর তার নিচের তাকে একটা টর্চ আছে। কুহু হাঁটতে শুরু করল অন্ধকারের মধ্যে।
ওমা! কুহু কতক্ষণ হাঁটছে কিন্তু সোফাটা কোথায়? টেবিলটাও কি গায়েব হয়ে গেল নাকি রে বাবা! এতক্ষণে তো ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চারবার পৌঁছে যাওয়ার কথা। একে ঠাণ্ডা তার উপর ঘোর অন্ধকার, কুহুর কেমন যেন কান্না কান্না পেল। একা একা পাশের ঘরে অ্যাডভেঞ্চার করতে এসে এরকম বিপদে পড়বে তা তো জানা ছিল না। কুহু ধপ করে মেঝের উপর বসে পড়ল। কিন্তু মার্বেলের মেঝে এরকম নরম নরম হল কি করে? কুহুর মনে হল ও যেন একরাশ পেঁজা তুলোর উপরে বসল। তুলোগুলো বড্ড ঠাণ্ডা; মুঠো করে ধরলে কেমন যেন গলে গলে যাচ্ছে। চারপাশে হাত বুলিয়ে কুহু দেখে মেঝে কোথায়; এতো বরফ! জেঠুমনিদের সল্টলেকের চারতলার বসার ঘরে বরফ! তার মানে কুহু স্বপ্ন দেখছে এতক্ষণ ধরে। ধুর! বলে কুহু ঝুরঝুরে বরফের উপর একটা লাথি কসাল।
“উফ বাবারে!” কে যেন চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠল। কুহুও টের পেল তার লাথিটা ঠিক বরফের উপরে লাগেনি বরং নরম গরম সিল্কের মত কিসের উপরে যেন একটা লেগেছে। কুহু লজ্জা পেয়ে একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “লেগেছে বুঝি?”
একটা গম্ভীর গলায় পাশের অন্ধকার থেকে উত্তর এল, “দেখতে তো কচি, কিন্তু হাত পা তো কিছু কম চলে না দেখছি।”
কুহু আরও লজ্জা পেয়ে বলল, “বড্ড অন্ধকার যে।” গম্ভীর গলাটা বলে উঠল, “তা ঠিকই। বড্ড অন্ধকার হয়ে গেছে।” কুহু গলার আওয়াজটা লক্ষ্য করে হাত বাড়াল। একটা সিল্কের মত মসৃণ আর খুব নরম নরম কীসে যেন কুহুর হাত ঠেকল। কুহু জিনিসটার গা ঘেঁষে এল। তার বড্ড ঠাণ্ডা লাগছে। সিল্কের নরম গরম জিনিসটা গম্ভীর গলায় বলল, “তুমি কি এখানেই থাকবে নাকি? আমি তো চলে যাব।”
কুহু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কোথায়?” যদি তাকে একলা ফেলে চলে যায় তাহলে এই ঠান্ডায় অন্ধকারে সে কি করবে?
“আমার দেশে।”
“কোথায় সেটা?”
“সে এক চিরতুষারের দেশ। সেখানে সারা বছর বরফ আর ঠান্ডা।”
“সেখানে তুমি থাকো?” কুহু সিল্কের জিনিসটার গরম গরম পেট ঘেঁষে বসল।
“থাকতাম। তোমার জেঠুমনি আমাকে তুলে নিয়ে এসেছে।”
“সে কি! জেঠুমনি তো…” বলেই ঢোঁক গিলল কুহু। আরেকটা কথা মনে হতেই কুহুর হাত পা কাঁপতে শুরু করে দিল, “তাহলে তুমি কি ভুত?” 
“ভুত কেন হব রে আমি?” গম্ভীর গলাটা কিঞ্চিৎ রাগ রাগ করে জিজ্ঞেস করল, “যতসব খুকুপনা।”
কুহুর এবার রাগ হল। ভুত হোক আর যাই হোক তাকে খুকু বলবে কেন? “জানো আমি গতমাসে ক্যারাটে ক্লাসে ভর্তি হয়েছি। আমি মোটেও খুকু নই আর।” মাথা ঝাঁকাল সে।
“হুম। আমি কে জানো?” গম্ভীর গলাটা আরও গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল।
কুহু বুকের ধুকপুকুনি সামলে কোনমতে ঘাড় নাড়ল, “না জানিনা।”
“আমি হলাম তুষাররাজা। আমার বিশাল বরফের সাম্রাজ্যে অগুন্তি প্রজার বাস। তাদেরকে ফেলে তোমাদের এই পচা গরমের দেশে থাকতে আমার বয়ে গেছে। আজকেই আমি ফিরে যাব আমার দেশে।”
“কিন্তু এখন তো কলকাতায় ভালোই ঠাণ্ডা।” কুহু কোনমতে বলল।
হা হা করে হেসে উঠল তুষার রাজা, “এটা কে ঠাণ্ডা বল তোমরা? আমাদের দেশে গরমকালেও এর থেকে চারগুন বেশী ঠাণ্ডা থাকে। তখন আমরা মাছ ধরার জন্য নেমে যাই সমুদ্রে। হাজার হাজার প্রজা একসাথে সাঁতার কাটে, মাছ ধরে, খায়, বরফের উপর দিয়ে পিছলে চলে মহাসমুদ্রের বুকে; সে এক আনন্দের মহাযজ্ঞ, না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না সেইসব দৃশ্য!”
“আর শীতকালে?” গল্পের সন্ধান পেয়ে কুহু উছলে উঠল।
“শীতকালে ভয়ংকর ঠাণ্ডা। তোমরা মানুষেরা তা সহ্যই করতে পারবে না। তখন ঝড়ের দেবী আধিপত্য বিস্তার করে আমাদের রাজত্বে। আমরা তার স্তব করে যাই সারা শীতকাল জুড়ে। তখন সব বাবা প্রজারা দু পায়ের ফাঁকে পেটের গরমে ডিম আগলে এক জায়গায় বসে থাকে জড়সড় হয়ে।”
“আর মায়েরা?”
“মায়েরা যায় সমুদ্রে খাবার খেতে। মাসখানেক বাদে তারা খাবার খেয়ে ফিরে এলে তারা ডিম বা বাচ্চা সামলায়, তখন আবার বাবারা যায় সমুদ্রে খাবার খেতে। এই ভাবেই আমাদের ছয়মাসের শীতকাল কাটে। ঠান্ডায়, ঝড়ে, অন্ধকারে। তারপর একদিন ছোট্ট একফালি সূর্য দেখা দেয় আকাশ ভেদ করে কিছুক্ষণের জন্য। আস্তে আস্তে দিন বাড়তে থাকে আর গরমকাল ফিরে আসে। শীতকালের ওই ভয়ংকর দিনগুলোতে আমাদের খুব কষ্ট হয়। কত ডিম ঝড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। কত ছোট ছোট প্রজার বলি নেয় ঝড়ের দেবী।” তুষার রাজার গলাটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে।
“তবু তোমরা ঝড়ের দেবীর আরাধনা কর?” কুহু ফুঁসে ওঠে, “তোমাদের উচিত ঝড়ের দেবীর বিরুদ্ধে লড়াই করা।”
“কক্ষনো না।” তুষার রাজার গলা নিমেষে গম্ভীর হয়ে ওঠে। “ঝড়ের দেবীর জন্যই আমরা বেঁচে থাকি। আমাদের দরকার হয় ঠান্ডার। শীতল কঠোর বরফ আর হিমাংকের নিচে থাকা বরফ জল। সেই জলেই আসে মাছ আর পোকা যেগুলো খাই আমরা। এতটুকু গরম আমরা সহ্য করতে পারি না। শুন্য তাপমাত্রার নিচে থাকাই আমাদের অভ্যাস। আমাদের শত্রু হল উষ্ণায়ন। যার পুজো কর তোমরা।”
“আমরা!” কুহু যারপরনাই অবাক হল। “আমরা কেন উষ্ণায়নের পুজো করব? এমনিতেই কলকাতায় কি গরম! গ্রীষ্মকালে তো টেঁকাই দায়। উষ্ণায়নের পুজো করতে আমাদের বয়েই গেছে।”
“কিন্তু তার জন্য তোমরা কি গাছ লাগাচ্ছ? তোমরা কি বন্ধ করে দিয়েছ ফ্রিজ, এসি, গাড়ী কেনা বা বনের পর বন ধ্বংস করে নতুন নতুন শহর গড়ে তোলা?” তুষার রাজার গলাটা কেমন যেন কর্কশ হয়ে উঠল।
কুহু হাঁসফাঁস করে উঠল, সত্যিই তো না তারা গাছ লাগায় না তারা কোন ব্যবস্থা নেয় এই উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে। “কিন্তু আমরা চাই না আরও গরম বাড়ুক পৃথিবীতে।” কোনরকমে বলল কুহু।
“তোমরা হয়ত চাও না কিন্তু তোমরা প্রকৃতি দেবীর পুজোও আর করো না। প্রকৃতি দেবীর পুজো না করলে উষ্ণায়ন শয়তান তোমার মাথার মধ্যে চেপে বসবে। আর একবার সে দখল নিয়ে নিলে সারা পৃথিবীকেই শেষ করে ফেলবে। এখনো সময় আছে তোমরা প্রকৃতি দেবীর পুজো শুরু কর আবার।”
কুহু একটু আনমনা হয়ে গেল। গতবছর তাদের পাড়ার ক্লাব থেকে ক্যাম্প করে পাড়ায় অনেক অনেক গাছ লাগান হয়েছিল, কিন্তু যত্নের অভাবে অধিকাংশ গাছই এক বছরের মধ্যে মারা গেছে। কুহু অবশ্য তার বাড়ীর সামনের গাছটায় জল দেয়। তবে দিন দুই আগে কুহু স্কুল ফেরত দেখল একটা গরু নতুন লাগানো একটা গাছকে খেয়ে নিচ্ছে। গুঁতিয়ে দেবে এই ভয়ে সে আর এগোয়নি কিন্তু এখন বেশ অনুতাপ হচ্ছে কুহুর। শুধু গাছ লাগালেই হবে না তারা যতদিন না বড় হয় তাদেরকে আগলে রাখতে হবে। কুহু ঠিক করল এইবারে যখন গাছ লাগানোর ক্যাম্প হবে তখন সে বলবে যাতে গাছগুলোর চারপাশে বেড়া দেওয়া হয় আর গরমের দিনগুলোতে গাছের চারাগুলোতে জল দেওয়া হয়।
“ঐ দেখ আমার রথ চলে এসেছে।” তুষাররাজার কথায় কুহু চমকে উঠল। সত্যিই তো একটা আলোর রথ এসেছে তুষাররাজাকে নিয়ে যেতে। ঝকঝকে নীল কঠিন বরফে তৈরি সেই রথ। এই ঘন অন্ধকারের মধ্যেই রথের গা থেকে আলো ঠিকরে পড়ছে চারপাশে। একটা বিশাল দাঁতওলা তিমিমাছের মত প্রাণী টানছে রথটাকে। কুহুতো ভয়ই পেয়ে গেল জন্তুটাকে দেখে।
“ও কিছু করবে না। ওকে বলে সীল মাছ। আমাদের মত ওরাও তুষাররাজ্যের প্রজা।” কুহুকে আশ্বস্ত করল তুষাররাজা। “তুমি কি আমাদের রাজ্য দেখতে যাবে নাকি খুকুমণি?”
“আমি? আমাকে নিয়ে যাবে?” কুহু এতটাই অবাক হল যে খুকুমণি ডাকে রাগ করতে ভুলে গেল।
“আসো আসো। রথে উঠে আসো।” তুষাররাজা হাত বাড়াল কুহুর দিকে। “আমদের রাজ্যটা দেখে নাও একবার।”
কুহু তুষাররাজার হাত ধরে উঠে এল রথের উপরে। হঠাৎ চারিদিক সুন্দর মিঠে আলোয় ভরে গেল। রথটা বরফের মেঝে ছেড়ে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে উড়ে গেল আকাশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কুহু দেখল নিচে উজ্জ্বল নীল মহাসমুদ্র আর সামনেই সেই উজ্জ্বল নীল গিয়ে মিলেছে ফিকে নীলের সঙ্গে। ফিকে নীল রঙ চলে গেছে দিগন্ত অবধি তার মাঝে মাঝে নানা রঙের সমারোহ কোথাও সাদা, কোথাও ফিকে সবুজ, কোথাও আবার সূর্যের আলোয় কমলা রঙ ঝলকে উঠছে। চির তুষারের দেশের রূপ দেখে কুহু বিভোর হয়ে গেল। এমন সময় তাদের রথটা গিয়ে বরফের মাঠে নামল। চারপাশে কালো কালো কোট পরা কুহুর মতন লম্বা কত লোক। কুহু একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এখানে এই ঠান্ডায় এত লোক কি করছে? 
“এই হল আমার রাজ্য। কেমন লাগছে খুকুমণি?” তুষাররাজা কুহুর পিছন থেকে বলে উঠল।
কুহু এতক্ষণে ঠিক করে দেখল তুষাররাজাকে। কুহুর মাথা ছাড়িয়েও এক হাত লম্বা, ভারীসারি মোটাসোটা রাজকীয় চেহারা, তীক্ষ্ণ হলুদ কালো ঠোঁট, চকচকে কালো নরম পালকে মোড়া সারা দেহ; সূর্যের আলোও পিছলে যাচ্ছে সেই তেল চকচকে সিল্কের পালকে। ও বাবা! তুষাররাজার পেটের কাছের পালক আবার সদ্য ঝরে পড়া বরফের থেকেও বেশী নরম কচি ধবধবে সাদা রঙের, কানের পাশে উজ্জ্বল হলুদ কমলা রঙের কানপট্টি আর তার উপরেই কালো পালক ভেদ করে ঝিকমিক করছে দুটো ছোট্ট ছোট্ট চোখ। নাহ! তুষাররাজাকে অসম্ভব রাজকীয় দেখতে কুহুকে মানতেই হল। জেঠুমণি আন্টার্টিকায় গিয়ে যে স্টাফড পেঙ্গুইনটা নিয়ে এসেছে তাদের কলকাতার ফ্ল্যাটে সেটার সাথে তুষাররাজার কোন তুলনাই হয় না। জেঠুমণির সেই পেঙ্গুইন দেখতে আর আন্টার্টিকার গল্প শোনার জন্যই তো কুহু বাবা মার সাথে জেঠুবাড়ী গিয়েছে। পেঙ্গুইনটার গায়ে কেউ তাকে হাত দিতে দেয়নি। তাই তো সে আর টুপলু মিলে প্ল্যান করেছিল রাত্রিবেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ওরা বেরিয়ে এসে পেঙ্গুইনটার সাথে খেলা করবে।
চারপাশ থেকে প্রচুর চেঁচামিচি শুনে কুহু মাথা ঘোরাল। ওমা! সে যাদেরকে কালো কোট পড়া লোক ভেবেছিল সেগুলো সব পেঙ্গুইন, তুষাররাজার প্রজা। আবার তাদের দলে গুটলু গুটলু সাদা সাদা তুলোর বলের মত ছোট ছোট ছানাও আছে। তবে! কুহুর ভাগ্য দেখ! কোথায় ভেবেছিল একটা পেঙ্গুইনের সাথে খেলবে তাই বাবা মায়ের কত বকাবকি, আর এখন সে সোজা তুষাররাজার রথে চেপে আন্টার্টিকায় চলে এসেছে পেঙ্গুইনের দলের সাথে খেলবে বলে।
সবাই মিলে নরম নরম ডানায় করে কুহুকে নামিয়ে ফেলল রথ থেকে। তারপর যে কত মজা করল কুহু সে কথা বলাই বাহুল্য। তুষাররাজা আর কুহুকে ঘিরে ধরে সবাই সুরেলা গলায় গান ধরল, কয়েকটা পেঙ্গুইন আবার ডানা ধরাধরি করে বরফের মধ্যে পিছলে পিছলে স্কেটিং ডান্স করল। বরফের উপরে কত ধরনের কসরত দেখাল কুহুকে। আর গুটলু গুটলু বাচ্ছাগুলোকে তো কুহু ছাড়তেই পারছেনা। তারা কুহুর কোলে কাঁধে উঠে পড়েছে। অনেকক্ষণ নাচগান চলার পরে তুষাররাজা সবাইকে যেন কি একটা হুকুম দিল। সবাই বরফের পাহাড়ের উপর দিকে পেটে ভর দিয়ে পিছলে পিছলে গিয়ে সমুদ্রে পড়ল। সেও এক অসাধারণ দৃশ্য। একটা করে পেঙ্গুইন সামনের পাহাড়টায় উঠছে আর তাদের সাদা সাদা পেটে ভর দিয়ে সোঁওওও করে পিছলে গিয়ে ঝপাং করে লাফিয়ে পড়ছে নীল জলে। তারপর আবার জল ফুঁড়ে লাফিয়ে উঠছে ঠোঁটে মাছ নিয়ে, চারিদিকে ছিটিয়ে পড়ছে হীরের টুকরোর মত জলবিন্দু।
কুহু কতক্ষণ ধরে পেঙ্গুইনদের মাছ ধরা দেখছিল কে জানে। একসময় খুব ঘুম পেল কুহুর, গুটলু গুটলু বাচ্ছাগুলোকে জড়িয়ে ধরে তুষাররাজার পেটের গরম পালকের মধ্যে কুহু ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমাতে ঘুমাতেই কুহু বুঝতে পারল তুষাররাজা তাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে। আবার রথটা আকাশে উড়ছে। শোঁ শোঁ করে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে চারধার দিয়ে। কুহু আরও গুটিসুটি মেরে তুষাররাজার কোলের মধ্যে ঢুকে পড়ল, তারপর কুহুর আর কিচ্ছু মনে নেই।
ঘুম ভাঙতেই কুহু দেখল মায়ের আগুনপানা মুখটা। ভালো করে চোখ কচলে উঠে বসল কুহু। ও মা ! কালরাতে কখন যেন তুষাররাজা তাকে জেঠুমণির ড্রয়িংরুমেই রেখে গেছে। মা কিছু বলার আগেই জেঠুমনি বলল, “আহা ছেড়ে দাও। বাচ্ছা তো, ওমনটা হতেই পারে।”
কুহুর মা রাগী রাগী গলায় বলল, “আপনি জানেন না দাদা। আমার হাড়মাস জ্বালিয়ে খেল একেবারে। অবস্থা দেখুন। মাঝরাতে উঠে চারিদিকে জল ছড়িয়েছে। আবার পেঙ্গুইনটাকে বিছানা বানিয়ে তার উপরে শুয়ে আছে। কত দামী জিনিস! আপনি কত কষ্ট করে সংগ্রহ করে এনেছেন।” আরেকটু হলেই মা একটা চড় বসিয়ে দিত কুহুর গালে। বাবার মুখ দেখেও মনে হচ্ছে খুব রাগ করেছে।
জেঠিমা মাকে সামলাল, “আচ্ছা করেছে তো কি হয়েছে। পরে ওকে বুঝিয়ে বলিস। এখন সক্কাল সক্কাল আর বকাবকি করতে হবে না।”
কুহু দেখে ড্রয়িংরুমের মেঝে একেবারে জল থই থই আর তার মাঝে শুয়ে আছে তুষাররাজা। এত জল এল কোথা থেকে? ও হো কালকে রাত্তিরে বরফ পড়েছিল তো। সকালবেলা সেটাই গলে জল হয়ে গেছে তারমানে। কিন্তু তুষাররাজার জন্য তো রথ এল তাহলে রাজামশাই ফিরে গেলেন না কেন?
কুহু ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে কালকে রাতের ঘটনাটা বলে ব্যাপারটা জানতে চাইল জেঠুমনির কাছে। পুরো ঘটনাটা শুনে জেঠুমনির চোখের কোণে ছোট ছোট দুটো হীরের কুচি ঝিকিয়ে উঠল। কোলে টেনে নিয়ে কত আদর করল কুহুকে, বলল তোর ভারী ভাগ্য কুহু তাই তুষাররাজা নিজে এসেছিল তোর সাথে দেখা করতে। জ্যাম্মা বুঝিয়ে দিল, তুষাররাজা তো সেই আন্টার্টিকাতেই মারা গেছিল। এবছর সেখানে অনেক অনেক পেঙ্গুইন মারা গেছে খাদ্যাভাবে। এই যে উষ্ণায়ন, তার জন্য বরফ গলে যায় আর পেঙ্গুইনদের খাবার জোটে না ঠিকঠাক। তাছাড়া মানুষ সমুদ্র থেকে কত কত মাছ ধরে নেয় সেইজন্যেও পেঙ্গুইনরা খাবার পাচ্ছে না। জেঠুমনিতো ওদেরকে নিয়েই আন্টার্টিকায় রিসার্চ করতে গিয়ে তুষাররাজার দেহটা খুঁজে পায়। তখন সেটা কলকাতায় নিয়ে আসে। কিন্তু তুষাররাজার এখানে ভালো লাগছিল না একটুও। তাই সে দেহটা এখানেই রেখে তার মনটা নিয়ে উড়ে চলে গেছে আন্টার্টিকায়, আর যাওয়ার আগে কুহুকে নিয়ে ঘুরে দেখিয়েছে তার দেশ।
কুহু ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে ঠিক করে নিল এবার থেকে সে আরও গাছ লাগাবে, আর একটা গাছও নষ্ট হতে দেবে না। তাদের ক্লাসের প্রত্যেকটা বন্ধুকে, পাড়ার সবাইকে বলবে সে প্রকৃতি দেবীর পুজো করার জন্য। চিরতুষারের দেশের প্রজারা যেন এই উষ্ণায়ন শয়তানের কবলে পড়ে আর না মারা যায়।
শীতের সকালের মিঠে কড়া রোদে ঝিকিয়ে উঠল তুষাররাজার কালো পালকগুলো। কুহুর বুকের মাঝে একটা গম্ভীর গলা বলে উঠল, “তোমার মত সব খুকুখোকা আমাদেরকে ভালোবাসলেই আমরা বেঁচে যাব। আর নষ্ট হবে না চিরতুষারের দেশ।”

গল্প

Digital Detox

Do you get that mini heart attack when you can’t find your cellphone in your pocket? Do you find yourself mindlessly checking your phone many times a day even when you know there is likely nothing new or important to see? 604 more words

THE TIGER

Tiger, tiger, burning bright

In the forests of the night…

When the stars threw down their spears,

And water’d heaven with their tears,

Did He smile his work to see? 650 more words

पर्यावरण दिवस और हमारा भारत।

Kmsraj51 की कलम से…..

ϒ पर्यावरण दिवस और हमारा भारत। ϒ

पिछले दिनो हमनें विश्व पर्यावरण दिवस (५ जून)  को मनाया। अगर मीडिया की तरफ देखें तो हमने यह पर्यावरण दिवस बहुत ही रुचि, सार्थकता, कर्तव्यपरायणता के साथ सम्पन्न किया। परंतु क्या वास्तव में ही ऐसा हो पाया है ? 121 more words

Kmsraj51

WARMER, ISN'T IT?

Ever seen a greenhouse? The glass panel lets light in, but doesn’t allow heat to escape. Therefore it’s used to grow plants especially during winters.The greenhouse effect is a naturally occurring phenomenon that is responsible for heating of Earth’s surface and atmosphere. 644 more words

Do We Deface Her?

What we are doing to the environment and wildlife is but a mirror reflection of what we are doing to ourselves and to one another. Often we claim, The Earth, as our mother and we use her for our purpose .Sometimes fencing animals, birds away from her .The heavy handed actions of the humans are finally showing some major results and giving us a wakeup call. 349 more words

World environment day observation 2017

Photos from Kendriya Vidyalay SAP Trivandrum as part of the World environment day  that was observation on June 5, 2017. Students came together to understand the need to protect the environment and too initiative in planting saplings in the school premises to have a greener campus.