Tags » Iland

দ্বীপাভিযান: সেন্ট মার্টিনস ২

২.
খুব সকালে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম, আজকে ট্যুরের আসল গন্তব্য সেইন্ট মার্টিনস দ্বীপে যাওয়া হবে। দেরী হয়ে যাচ্ছিলো তাই সকালের নাস্তা গাড়িতে খেতে খেতে ৮৫ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ এ রওনা দিলাম। খুব কড়া রোদ, এই কড়া রোদের মাঝেও ঘন কুয়াশা। কুয়াশা যেন সূর্যের তীব্রতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার বাম পাশ দিয়ে আবছা ভাবে পাহাড় দেখা যাচ্ছে, মায়ানমারের পাহাড়। চারপাশে সোনালী ধানক্ষেত, চায়ের স্টল, দূরন্ত ছেলেমেয়ের দলের দুরন্তপনা, গ্রামের বাজার দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম টেকনাফ এ। কাটায় কাটায় ৯ টায় নাফ নদীতে রাখা জাহাজে উঠলাম, ছাড়বে সাড়ে ৯ টায়। গাড়িতে আসার সময় জানালা খোলা ছিলো, সেই খোলা জানালার বাতাস লেগে আমার একটুতেই ঠান্ডা লেগে গেল। আমরা জানালার পাশে একটা টেবিলের পাশে বসলাম। একসময় জাহাজ ছেড়ে দিলো। আমরা ডেকে যেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। আমার ঠান্ডা জ্বরে পরিণত হলো। আমাদের জাহাজ ঘিরে প্রচুর শঙ্খচিল উড়ছিলো। বসে বসে তাদের উড়াউড়ি দেখতে দেখতে ১১.৩০ টার দিকে জাহাজ বঙ্গপোসাগরে পড়লো। হঠাৎ জাহাজ একদিকে কাত হয়ে গেল। আমরা যেদিকে, সেই দিকটা নিচে। আমার ক্ষীণ সন্দেহ হলো আমার ওজনের কারনেই এদিকে ঝুঁকেছে কিনা। মৌনতাকে সেটা বলার পর ও আমাকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করলো। আমার মনে হলো ওকে ইচ্ছামতো গালি দেই, সামনে দুইজন ‘বড় মানুষ’ আছে তাই ফাজিলটা বেচে গেলো। ততক্ষণে জাহাজ দ্বীপে ভিড়েছে। আমরা নেমে অবাক হয়ে গেলাম। কী সুন্দর টলটলে নীল পানি! চারপাশ দিয়ে সবুজ ‘কাটা ফল’ আর নারকেল গাছের সারি, বেলাভূমিতে বিশাল বিশাল মৃত প্রবাল, বালুর রঙও কত পরিষ্কার! যদিও তখন রোদ ছিল, তবুও সাগরের পানির দিকে তাকিয়ে মনটা প্রশান্ত হয়ে উঠলো। পুরোটা দ্বীপ ঘুরে দেখার জন্য সময় ২ ঘন্টা, জাহাজে ২.৩০ টার মধ্যে পৌছাতে হবে। দলের বাকি সবাই হা হুতাশ করতে থাকলো, কেন এখানে এক-দুই রাত থাকার পরিকল্পনা নিয়ে আসিনি! আমরা সময় স্বল্পতার কারণে আপাতত দুইটা জায়গা ঘোরা ঠিক করলাম- হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি ‘সমুদ্র বিলাস’ আর নারিকেল গাছের বন ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’। আমরা নেমেই দ্বীপের একমাত্র যান ছোট একটা ভ্যান এ চাপাচাপি করে বসলাম। ভ্যান সরু পথ দিয়ে কখনো বাজার, কখনো মানুষের বাড়ি, কখনো সমুদ্রের পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে থাকলো। আমরা পাথুরে রাস্তার সময় ভ্যান থেকে নেমে হেটে যেতে থাকলাম। হুমায়ূন আহমেদের বাড়িতে পর্যটকদের ঢোকা নিষেধ, আমরা বাইরে থেকে দেখতে পেলাম না তেমন কিছুই। শেষে বাড়ির নামফলকের পাশে ছবি তুলে ক্ষান্ত দিয়ে ডাবের পানি খেতে খেতে প্রবালের উপর বসে ছবি তুলতে থাকলাম। একদম ছোট ছোট মেয়েরা কিছুক্ষণ পরপর ছোট ছোট প্রবাল, শামুক, ঝিনুকের খোল, কড়ি বিক্রি করার চেষ্টা করলো। আমরা কিনতে না চাইলে একটা কড়ি অথবা শামুক দিয়ে বললো, ‘আপনাদের জন্য গিফট।’ আব্বু বললো, ‘এত গিফট দিতে থাকলে নিজেরা কী বেচবা?’ আমি বললাম, ‘শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের জন্য!’
আমরা ভ্যান দিয়ে নারিকেল জিঞ্জিরায় পৌঁছে গেলাম। সারি সারি নারিকেল গাছের সারি। প্রচুর মানুষ একটার পর একটা ছবি তুলছে। সময়ে কুলালো না তাই আমরা জাহাজের দিকে রওনা দিলাম। এতদূর ঘোরানোর জন্য ভ্যানওয়ালা মামাকে ৬০০ টাকা দিতে হলো। জাহাজে উঠে আমার আবার জ্বর আসলো। আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আব্বুর দেওয়া ওষুধের প্রভাবে এক রকম ঘোরের মধ্যে ঘুম সারলাম। ঘুম থেকে উঠে জাহাজের নিচের ডেকে আমি আর মৌনতা হাটতে থাকলাম। ওইখানে যেয়েই জাহাজ ঘিরে রাখা শঙ্খচিলদের রহস্য পরিষ্কার হলো। কিছু ছোট ছেলে সুর করে ‘পাখি বিস্কিট খায়’ বলতে বলতে বিস্কুট বিক্রি করছে। আমার কাছে এটা অদ্ভুত লাগলোনা, সকালে দেখেছি হকাররা সুর করে ‘আলো আলো প্রথম আলো’ গাইতে গাইতে ৫ টাকা দাম বাড়িয়ে প্রথম আলো পত্রিকা বিক্রি করছে।
মানুষ বিস্কুট কিনে নিজেরা ওই ছোট ছেলেদের মতো ‘পাখি বিস্কিট খায়’ বলতে বলতে বিস্কুট ছুড়ে দিচ্ছে আর শঙ্খচিলেরা সেই বিস্কুট খাওয়ার জন্য ভীড় করছে! আমি বিড়বিড় করে বললাম, ‘মানুষ বিস্কুট খাওয়ায়!’ মৌনতা হেসে দিলো। হঠাৎ আমার মনে হলো জীবনটা এতো খারাপও না!
২ ডিসেম্বর ২০১৬

Bangladesh

দ্বীপাভিযান: সেন্ট মার্টিনস ১

১.
বাস কুমিল্লায় যাত্রা বিরতির জন্য থামার পরপরই আমি গো ধরলাম, ঢাকা যাওয়ার সময় বাসে যাবোনা- এখনই প্লেনের টিকিট কাটো। আমাদের ভ্রমণকারী দলের বাকি তিনজন সদস্য আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। বাকি তিনজন বলতে আমার আম্মু, আব্বু আর ছোটবোন মৌনতা। মৌনতা বললো, ‘আব্বু ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সব চাইতে ভয়ংকর রোলার কোস্টারে উঠেছে।’ আমি বললাম,’এটা তো রোলার কোস্টার ছাড়ায় গেসে।’ সবাই আমাকে নিয়ে এবারে হাসাহাসি শুরু করে দিলো। আমি মুখ গোমড়া করে বসে থাকলাম, আব্বু বললো,’বাথরুমে যাও, বাসের মধ্যে কিছু হইলে ট্যাক্সি পাবোনা!’ সবাই রেস্টুরেন্ট কাপিয়ে হেসে দিলো, আমার গোমড়া মুখ আরো গোমড়া হয়ে গেলো।’সব পাকিস্তানিদের দোষ’ বলে আমি উঠে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালাম। বছর খানেক আগে আমরা মালয়েশিয়া ঘুরতে গিয়েছিলাম। শেষের দিন কুয়ালালামপুরের টাইম স্কয়ার ঘোরার কথা। তার আগে শহরের এক পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট এ রাতের খাবার সারতে গেলাম। সেই খাবার খেয়ে আমার পেটের ভেতর গ্রিন হাউজ ইফেক্ট শুরু হয়ে গেলো। একটা ট্যাক্সিতে উঠে সেদিনের ঘোরাঘুরি বরবাদ করে মনে মনে সারা রাস্তা পাকিস্তানিদের বকতে বকতে হোটেলে ফিরে এলাম। এই হলো কাহিনী।
এদিকে গত বছর দিনাজপুরে একটা গাড়িতে ঘোরার সময় হঠাৎ গাড়ির ব্রেক ফেইল করলো। একটার পর একটা গাড়ি পাশ কাটিয়ে আমরা যে কীভাবে বেঁচে গেলাম! তার মধ্যে আমি ছিলাম সামনের সিটে। সেই দিন থেকে সড়ক পথে ভ্রমণ আমার জন্য ভীতিপ্রদ হয়ে দাঁড়ালো, রিকশায় উঠলে তো কথাই নেই, তবুও প্রয়োজনে রিকশায় উঠতে হয়। প্লেনে উঠলে অন্তত ককপিট দেখা লাগেনা, চারপাশে শুধু মেঘ। তাই আমি আতংকে অস্থির হয়ে এমন অস্বাভাবিক ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। একটুক্ষণের জন্য মনে হলো পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত, যাতে অন্তত বাসে উঠে ভয়ে কাঠ হয়ে থাকতে না হয়।
যাত্রাবিরতির পর গাড়ি ছেড়ে দিলে আমি হাত পা শক্ত করে বসে থাকলাম। মৌনতা বললো, ‘এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই। চোখ বন্ধ করে মনে করো প্লেন ল্যান্ড করছে।’ আমি তাই করলাম। আরো ৪ ঘন্টা প্লেন ল্যান্ড করতে করতে কক্সবাজারের কাছাকাছি চলে আসলাম। অনেকদিন পর সকাল হওয়া দেখালাম। আস্তে আস্তে একদম অন্ধকার থেকে আলো হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। আকাশের প্রতিবিম্ব হাইওয়ের পাশের গ্রাম্য পরিবেশের পুকুর গুলোয় অসাধারণ লাগছে। এখন নিশ্চয় ধান কাটার মৌসুম, কিছুক্ষণ পরপর আবছা আলোয় অর্ধেক কাটা সোনালী ধানক্ষেত দেখা যাচ্ছিলো।
রেস্টহাউজে উঠে সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি একা একা সমুদ্রের পাড়ে হাটতে বেড়ুলাম। স্পঞ্জ স্যান্ডেল পড়ে দীর্ঘ বালুময় পথ পাড়ি দিয়ে সমুদ্রের কাছাকাছি চলে গেলাম। অনেক কম মানূষজন। যারা আছে তারা কোনো একটা দল নিয়ে আছে। আমিই শুধু একা। ভেজা বালুর মধ্যে পা রাখতেই সাদা ফেনাওয়ালা ঢেউ আমার পায়ে আছড়ে পড়লো। আমার পায়ের নিচ থেকে বালু সরে যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন বালু গুলো আমাকে জোর করে সমুদ্রের আরো কাছে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। লোনা বাতাস আমার মুখে ঝাপটা মেরে গেল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পেছনে ফিরে গেলাম, কিছুদূর যেয়ে সমুদ্রের তীরে প্রথম একদম একা হাটার স্মৃতিস্বরূপ কিছু নকশা করা শামুক আর খাঁজকাটা ঝিনুক তুলে নিলাম। হঠাৎ আজানা কারনে আমার মনটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে গেল। আমি সেই বিষাদময়তা নিয়ে সমুদ্রের দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে বুঝলাম, সমুদ্র আসলেই আমার খুব প্রিয়। আমি আবার সেই দীর্ঘ বালুময় পথ দিয়ে হাটা শুরু করলাম।
দুপুরে আমরা সবাই মিলে আবার সমুদ্রে আসলাম। আম্মু আর মৌনতা লোনা পানিতে ভিজতে থাকল, আমি আর আব্বু ক্যামেরা নিয়ে এটা সেটার ছবি তুলতে থাকলাম। আমি ফটোগ্রাফির কিছুই বুঝিনা, শুধু ক্যামেরায় ক্লিক করে ছবি তুলতে পারি। তবুও অনেক কিছুর ছবি তুললাম। ঝালমুড়ি ওয়ালা, সার্ফার, ঘোড়া, শামুকের জিনিস বিক্রেতা, বেলুন বিক্রিরত শিশু, লাইফগার্ড – আরো অনেক কিছু।
বিকালে আমি শাড়ি পড়ে গেলাম সমুদ্রের পাড়ে, এবার মৌনতা ক্যামেরাম্যান। বিকালের সমুদ্র খুবই সুন্দর। ঢেঊ গুলো আরো বড়, ফেনাগুলো আরো সাদা, ল্যান্ডস্কেপটা বেশিই জোস। নিজের ছবি মৌনতাকে দিয়ে কয়েকটা তুলিয়ে আবার ছবি তুলতে বসে পড়লাম। বারান্দায় এসে সূর্য ডোবা দেখলাম। মনে হচ্ছিলো সূর্যটা যেন সমুদ্র গহবরে হারিয়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় সুগন্ধা বিচ থেকে আনা সামুদ্রিক খাবার- কাকড়া, স্কুইড, লবস্টার রেস্টহাইজের কাছে একটা ছাদহীন ক্যাফেতে বসে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে রাতের খাবার সারলাম। সাথে ছিলেন আব্বুর বন্ধু লিয়াকত আংকেল। তিনি মাত্রই সেইন্ট মার্টিনস থেকে ঘুরে আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন। তার মতে, ‘সেইন্ট মার্টিনস এ কিচ্ছুই নাই। খালি স্বচ্ছ পানি। যাওয়ার কোনো মানেই হয়না। ভ্যানে বসে ঘুরতে ঘুরতে আমার হাটু ব্যথা হয়ে গেসে।’ আম্মু আর মৌনতা আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। আমি তাদের দৃষ্টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে খাওয়ার মন দিলাম। মাথার উপরে গাঢ় কালো আকাশে আব্বুর চিনিয়ে দেওয়া কন্সটেলেশন অরিয়ন আর ক্যাসিওপিয়া চিনতে পারলাম। তারাভরা আকাশ আর সাদা সমুদ্রের ফেনা দেখতে দেখতে রাতের ভোজ সম্পন্ন করলাম।
ডিসেম্বর ১, ২০১৬

Bangladesh